শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ বা ট্রেডিং করতে গেলে মার্কেট সেন্টিমেন্ট টার্মটির কথা প্রায়শই শোনা যায়। মার্কেট সেন্টিমেন্ট স্টক মার্কেট ইনডেক্স, এমনকি একক কোনো শেয়ারের পারফরমেন্স ও গতিবিধিকেও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। সেই কারণে শেয়ার বাজারে মুনাফা করতে গেলে বাজারের প্রবণতা সম্পর্কে জানা খুব জরুরি। মার্কেট ইমোশন বা সেন্টিমেন্ট কত ধরনের হয় এবং কীভাবে সঠিক আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে মার্কেট সেন্টিমেন্ট অ্যানালাইস করবেন সেই বিষয়েই আলোচনা করব আমরা।
মার্কেট সেন্টিমেন্ট কী?
কোনো নির্দিষ্ট একটি স্টক, গোটা ইন্ডাস্ট্রি বা মার্কেটের কোনো একটি অংশ সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের সামগ্রিক মনোভাবকে মার্কেট সেন্টিমেন্ট বলে। মার্কেট সেন্টিমেন্ট দেখায় যে কোনো নির্দিষ্ট একটি অ্যাসেট সম্পর্কে বিনিয়োগকারীরা কী ভাবছেন, এবং এই ভাবনাচিন্তা একাধিক বিষয় দ্বারা প্রভাবিত হয়, যেমন ইকোনমিক ডেটা, খবরাখবর, কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের পরিবর্তন, বা বড় কোনো আর্থিক পরিস্থিতি। এই সবগুলির একত্রিত সেন্টিমেন্ট শেয়ারের দামে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে এবং সেন্টিমেন্ট নেগেটিভ নাকি পজেটিভ সেই অনুযায়ী শেয়ারের দাম কমবে নাকি বাড়বে নির্ভর করে।
মার্কেট সেন্টিমেন্টের ধরন:
→ পজিটিভ মার্কেট সেন্টিমেন্ট: যখন বিনিয়োগকারীরা বাজার সম্পর্কে ইতিবাচক থাকেন অর্থাৎ বাজার গ্রো করবে এই বিষয়ে আশাবাদী থাকেন সেইসময় বেশি করে শেয়ার কেনার ফলে শেয়ারের চাহিদা বাড়তে থাকে, যার ফলস্বরূপ দাম বাড়ে। এবার প্রশ্ন আসতে পারে যে, হঠাৎ কী কারণে মার্কেটের প্রতি positive outlook তৈরি হয়? বিনিয়োগকারীরা একাধিক কারণে বাজারের প্রতি আশাবাদী হতে পারেন। যেমন সমগ্র রাজ্যের শক্তিশালী ইকোনমিক ডেটা, কোম্পানির লাভজনক কোনো খবর, সরকারের নতুন কোনো উদ্যোগ বা ব্যবসা বা অর্থনীতির ক্ষেত্রে সহায়ক হবে ইত্যাদি একাধিক কারণে বাজারের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বা positive market sentiment তৈরি হয়। এই সেন্টিমেন্ট বেশ অনেকটা সময় ধরে চললে স্টকের দাম ব্যাপক হারে বাড়তে থাকে এবং একটি বুলিশ মার্কেট তৈরি হয়।
→ নিউট্রাল মার্কেট সেন্টিমেন্ট: বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বাজার সম্পর্কে যে সবসময় আশাবাদী মনোভাব থাকবে, এমন নয়। যখন আর্থিক ডেটা বা অন্য কোনো তথ্যের মাধ্যমে বাজারে টালমাটাল পরিস্থিতি তৈরি হয় তখন বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে আসে। এই সময় বাজারে সামান্য ভোলাটিলিটি দেখা যায় এবং ট্রেডের সংখ্যাও কমে যায়।
→ নেগেটিভ মার্কেট সেন্টিমেন্ট: অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বা আর্থিক ফলাফল খারাপ হলে বিনিয়োগকারীরা বাজার সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব দেখান। এর ফলস্বরূপ selling বেড়ে যায় এবং শেয়ারের দাম পড়তে থাকে। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, কোম্পানির প্রফিট কমে আসা অথবা অর্থনৈতিক মন্দা–– ইত্যাদি নেগেটিভ খবরগুলি বাজারের প্রতি অনাস্থা তৈরি করে।
কীভাবে অ্যানালাইস করবেন কখন মার্কেট সেন্টিমেন্ট কেমন থাকবে?
বেশ কয়েকটি উপায়ে মার্কেট সেন্টিমেন্ট সম্পর্কে অ্যানালাইস করা যায়। যেমন—
1. ফিনান্সিয়াল রিপোর্ট অ্যানালাইসিস: প্রতি তিনমাস অন্তর কোম্পানি আর্থিক রিপোর্ট প্রকাশ করে এবং আর্থিক উপদেষ্টারা রিপোর্ট প্রকাশের আগে কোম্পানির আয় ব্যয় নিয়ে সম্ভাব্য আলোচনা করেন এবং আয়-ব্যয়ের একটি পূর্বাভাস দেন। অ্যানালিস্টদের সম্ভাবনার তুলনায় কোম্পানির ফলাফল খারাপ হলে বিপরীত market sentiment তৈরি হয়। অন্যদিকে যদি আর্নিং বাড়ে, মার্কেটের মনোভাব বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয় এবং শেয়ারের দাম বাড়ে। যে বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির এই রিপোর্টগুলি অ্যানালাইস করেন তাঁরা মার্কেট সেন্টিমেন্ট সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন।
2. সমাজ মাধ্যমে মার্কেট সেন্টিমেন্টের অ্যানালাইসিস: অনেক বিনিয়োগকারী স্টক নিয়ে বিভিন্ন সমাজ মাধ্যমে নিজেদের ধারণা প্রকাশ করেন। এই ধরনের আলোচনা থেকে কোনো কোম্পানি বা মার্কেট সম্পর্কে সামগ্রিক মনোভাব বোঝা যায়। সোশ্যাল মিডিয়ার এই অ্যানালাইসিসগুলি থেকে কোনো খবর বা ইভেন্ট সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের মনোভাব কেমন তা জানা যায়।
3. মার্কেট সেন্টিমেন্ট ইন্ডিকেটর: একাধিক টেকনিক্যাল ইন্ডিকেটর রয়েছে যা মার্কেট সেন্টিমেন্ট বুঝতে সাহায্য করে। এই ইন্ডিকেটরগুলি অতিরিক্ত ক্রয় বা বিক্রয়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানায়। এই ইন্ডিকেটরগুলি ব্যবহার করে মার্কেট সেন্টিমেন্ট সম্পর্কে বিনিয়োগকারীরা কিছুটা আন্দাজ করতে পারেন।
শেয়ারবাজারের সেন্টিমেন্ট স্টকের দামে কেমন প্রভাব ফেলে তার ভূরি ভূরি উদাহরণ রয়েছে। তা সে ২০২২-এর অক্টোবরে ইলন মাস্কের টুইটার অধিগ্রহণের সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে টেসলার শেয়ারের দাম কমে যাওয়া হোক বা ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে হিন্ডেনবার্গের রিপোর্ট সামনে আসার পর আদানির সমগ্র স্টকে তার ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব হোক— মার্কেট সেন্টিমেন্ট ব্যাপক হারে শেয়ারের দামে প্রভাব ফেলে।
এবার চলুন জেনে নেওয়া যাক প্রধান কয়েকটি মার্কেট সেন্টিমেন্ট ইন্ডিকেটর কোনগুলি।
→ BPI বা Bullish Percent Index: এই ইনডেক্সটি দেখায় যে, nifty 50 বা sensex-এর মতো ইনডেক্সের মধ্যে কত শতাংশ ইক্যুইটি বা শেয়ারের বুলিশ ট্রেন্ড রয়েছে। BPI যদি high থাকে তাহলে বোঝায় মার্কেট বুলিশ রয়েছে, low থাকলে মার্কেটের নেতিবাচক ইঙ্গিত বোঝায়।
→ Moving Average: Moving average দেখে বোঝা যায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যেমন ৫০ দিন বা ২০০ দিনে কোনো স্টকের গড় দাম কত টাকার মধ্যে রয়েছে। ৫০ দিন বা ২০০ দিনের গড় দামের high বা low হলে বুঝতে হবে মার্কেট সেন্টিমেন্ট পরিবর্তন হচ্ছে, যাতে সম্ভাব্য ক্রয় অথবা বিক্রয় বাড়তে পারে।
→ VIX বা Volatility Index: এটি বাজারের ভোলাটিলিটির সম্ভাবনা দেখায়। VIX value বেশি থাকলে বাজারের অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগকারীদের মনে দুশ্চিন্তা বোঝায়। আর এই value কম থাকলে বুঝতে হবে বিনিয়োগকারীরা যথেষ্ট আশাবাদী।
→ 52 week high and low: ৫২ সপ্তাহে কোন শেয়ারগুলি নিজেদের দামের high বা low-তে পৌঁছেছে তা জানায় এই ইন্ডিকেটরটি।
→ Put and call ratio: এই টেকনিক্যাল রেশিওটি দেখায় call option-এর অনুপাতে মার্কেটে put option-এর ratio কত। এই রেশিওটি বেশি হলে মার্কেট bearish হয় অর্থাৎ অধিকাংশ মানুষ মনে করেন বাজার পড়বে। অন্যদিকে এই রেশিওটি কম হলে বুঝতে হয় মার্কেট bullish হবে অর্থাৎ অধিকাংশ মানুষ মনে করেন বাজার উঠবে।
সুতরাং শেয়ার বাজার কেমন পারফর্ম করবে তা মার্কেট সেন্টিমেন্ট সম্পর্কে জানা যায়। আর কোনো বিনিয়োগকারী মার্কেট সেন্টিমেন্ট সম্পর্কে ভালোভাবে অ্যানালাইস করতে পারলে সম্ভাব্য মার্কেটের গতিবিধি সম্পর্কে সামান্য ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে, এবং সেই অনুযায়ী তাঁরা সঠিক বিনিয়োগ সিদ্ধান্তও নিতে পারবেন।





