শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সময় কিছু বিশেষ শব্দ বা টার্ম আমরা শুনতে পাই, যেগুলির অর্থ বোঝা শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে খুবই জরুরি। অথচ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলি না বুঝেই আমরা ঝুঁকিপূর্ণ বাজারটিতে বিনিয়োগ করে ফেলি। আজ আমরা সেইরকমই দুটি বিশেষ টার্মের ব্যাপারে খুঁটিনাটি জানব যেটি শেয়ারবাজারে বহুল প্রচলিত। কী সেই শব্দবন্ধ? সেগুলি হল – IPO এবং FPO। চলুন আজকে এই বহু ব্যবহৃত শব্দবন্ধ দুটি নিয়ে একটু আলোচনা হয়ে যাক।
আজকের আলোচনায় যে বিষয়গুলির প্রতি লক্ষ থাকবে সেগুলি হল –
IPO কী?
IPO-এর ধরন।
FPO কী?
FPO-এর ধরন।
IPO ও FPO-এর মধ্যে পার্থক্য।
আপনার জন্য কোনটি লাভজনক– IPO না FPO?
IPO কী?
IPO-এর পুরো কথা হল Initial Public Offering। কথাটির মধ্যেই ‘initial’ কথাটি রয়েছে অর্থাৎ ‘প্রথমবার’। এটি একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে একটি প্রাইভেট কোম্পানি সাধারণ জনগণের উদ্দেশ্যে ‘publicly’ প্রথমবারের জন্য কোম্পানির শেয়ার ইস্যু করে। যে কোম্পানিটি শেয়ার ইস্যু করে তাকে ‘issuer’ বলা হয়। একবার IPO-এর পদ্ধতিটি সম্পন্ন হলে কোম্পানি নিজের শেয়ার খোলা বাজারে লেনদেন করতে পারে। কোনো কোম্পানির অর্থসংগ্রহের প্রাথমিক উৎস হল এই IPO এবং এর বদলে যারা IPO কেনেন, সেইসব বিনিয়োগকারীদের কোম্পানির শেয়ার প্রদান করা হয়। এই IPO ইস্যুর মাধ্যমে ছোটো সংস্থা, যারা ব্যবসা বাড়াতে চায় বা বড়ো কোনো বেসরকারি সংস্থা একটি publicly listed company-তে পরিণত হয়। IPO-র মাধ্যমে কোম্পানির শেয়ার বিক্রির ফলে কোম্পানি fund সংগ্রহ করে এবং ব্যবসাকে বাড়াতে পারে।
IPO-এর ধরন : দুইধরনের IPO হয়–
Fixed Price Issue :
Fixed Price Issue অর্থাৎ কোম্পানি তাদের প্রতিটি শেয়ারের একটি নির্দিষ্ট দাম নির্ধারণ করে এবং সেটি offer document-এ উল্লেখ করে।
এই ধরনের IPO-র ক্ষেত্রে কোম্পানি সাধারণের জন্য শেয়ার ইস্যু করার আগেই প্রত্যেক বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির নির্ধারিত শেয়ারমূল্য জেনে যান। ফলে তাঁরা IPO সাবস্ক্রাইবের জন্য সেই নির্দিষ্ট অর্থই প্রদান করেন।
Book-Building Issue :
Book building issue মানে যখন কোম্পানি শেয়ারের দাম নির্দিষ্ট করে রাখে না, বরং দামের একটি সীমা রাখে। যেমন, যদি দামের সীমা বা Price band ১৫০ থেকে ২০০ টাকা থাকে, তার অর্থ শেয়ারটি এই নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বিক্রি হবে। বিনিয়োগকারীর চাহিদার উপর ভিত্তি করেই দাম নির্দিষ্ট করা হয়।
দুইরকমভাবে IPO ইস্যু করা যায়।
এক, নতুন শেয়ার ইস্যু করা যেতে পারে। এর ফলে ব্যবসায় fund সংগ্রহ হয় ও capital অর্থাৎ মূলধন বাড়ে।
দুই, কোম্পানির Existing শেয়ার বিক্রির জন্য ইস্যু করা যেতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে মূলধনে কোনো প্রভাব পড়বে না কারণ ইস্যু হওয়া শেয়ারের থেকে যে অর্থাগম হবে, তা সেই সমস্ত শেয়ারহোল্ডাররাই পাবেন যাঁদের existing শেয়ার ইস্যু করা হয়েছে।
তবে IPO ইস্যু করার ক্ষেত্রে কোম্পানিকে কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করতে হয়। কোনো সংস্থার প্রোমোটারদের SEBI এবং কোম্পানি আইনের নির্দেশিত নিয়মগুলি মেনে IPO বাজারে ছাড়তে হয়।
FPO কী?
FPO-এর পুরো কথা হল ‘Follow on Public Offer’। FPO-এর মাধ্যমে কোম্পানিগুলি, যারা ইতিমধ্যেই স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত রয়েছে, তারা শেয়ার ইস্যু করে কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের বা নতুন বিনিয়োগকারীদের। কোম্পানির ইক্যুইটি বেস বাড়াতে অর্থাৎ কোম্পানির সম্পদ বা asset বাড়াতে FPO ইস্যু করা হয়। FPO তখনই কোনো কোম্পানি ব্যবহার করে যখন সেটি ইতিমধ্যে fund সংগ্রহের জন্য বাজারে IPO ছেড়েছে। সহজ কথায় বলতে গেলে IPO যদি হয় প্রথম ইস্যু, FPO হল আরও একবার fund সংগ্রহের জন্য ইস্যু।
দুটি উদ্দেশ্য নিয়ে FPO আনা হয় –
কোম্পানির ঋণ কমাতে
নতুন মূলধন সংগ্রহে
FPO-এর ধরন :
IPO-এর মতো FPOও দুইধরনের হয়–
Dilutive FPO : Dilutive FPO হল যখন কোম্পানি আরও বেশি fund সংগ্রহ করতে আরও শেয়ার ছাড়ে বাজারে। মূলত ঋণ পরিশোধের জন্য এটি করা হয়। তবে Dilutive FPO-এর ক্ষেত্রে শেয়ার সংখ্যা বাড়ে, যার ফলে কোম্পানির শেয়ার প্রতি আয় বা earning per share (EPS) কমে যায়।
Non-dilutive FPO : এক্ষেত্রে কোম্পানির মালিক বা কোম্পানির বড় শেয়ারহোল্ডাররা তাদের শেয়ারগুলি বাজারে ছাড়ে। Non-dilutive FPO-র ক্ষেত্রে যে অর্থাগম হয়, তা সেই নির্দিষ্ট ব্যক্তির খাতে যায়, কোম্পানির খাতে নয়। তাই EPS বা earning per share-এ কোনো পরিবর্তন হয় না।
IPO ও FPO-র মধ্যে মূল পার্থক্য :
উদ্দেশ্যগত পার্থক্য : IPO-র উদ্দেশ্য হল ব্যবসা বৃদ্ধির জন্য জনসাধারণের কাছে কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে মূলধন সংগ্রহ করা। অপরপক্ষে FPO-র উদ্দেশ্য হল ব্যবসা বৃদ্ধিলাভের পর যদি কোনো অতিরিক্ত তহবিলের প্রয়োজন হয়, তখন সেটি সংগ্রহ করা।
কোম্পানির অবস্থানগত পার্থক্য : IPO-র ক্ষেত্রে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানি এটি ইস্যু করে। অর্থাৎ আইপিওর মাধ্যমে তারা শেয়ার বাজারে আত্মপ্রকাশ করে। অন্যদিকে স্টক মার্কেটে ইতিমধ্যে তালিকাভুক্ত রয়েছে এমন কোম্পানি FPO ইস্যু করে।
কার্যগত পার্থক্য : IPO-র ক্ষেত্রে যেহেতু কোম্পানিটি নতুন এবং তালিকাভুক্ত নয়, তাই এতে বিনিয়োগ করার সময় বিনিয়োগকারীদের কাছে বিশেষ তথ্য থাকে না। এক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা কোম্পানি দ্বারা প্রদত্ত প্রাথমিক নথি যাকে ‘Red herring prospectus’ বলে, সেই নথি থেকে কোম্পানি সম্বন্ধে জানতে পারে। সেই নথি থেকে IPO-তে সাবস্ক্রাইবের আগে কোম্পানির ঋণ, সুদের হার ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা করতে হয় বিনিয়োগকারীদের।
তবে FPO-র ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোম্পানিটির সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের সম্যক ধারণা আগে থেকেই থাকে। কোম্পানিটি IPO-তে কেমন পারফর্ম করেছে তার রেকর্ড দেখে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিবেচনা করতে পারেন।
লাভগত পার্থক্য : IPO, FPO-এর তুলনায় বিনিয়োগকারীদের বেশি রিটার্ন দিতে পারে এবং বেশি লাভজনক প্রমাণিত হতে পারে। IPO বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, FPO-র তুলনায়। FPO-তে যেহেতু কোম্পানি সম্পর্কে অনেক তথ্য আগে থেকেই উপস্থিত থাকে তাই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কম থাকে। উপরন্তু বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির বৃদ্ধি সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা করতে পারে FPO-র ক্ষেত্রে।
FPO-তে লাভ বা রিটার্ন কম আসে IPO-র তুলনায় কারণ এই সময় কোম্পানি একটি স্থায়ী অবস্থায় পৌঁছে যায়।
কোনটি বেশি লাভদায়ক বিকল্প?
এক একটি বিনিয়োগ, এক একজনের ক্ষেত্রে লাভজনক। এটা কখনোই বলা যায় না যে, আপনার জন্য যেটা লাভজনক সেটা অন্য আরেকজনের জন্যও লাভজনক হবে। প্রত্যেক বিনিয়োগের কিছু ভালো এবং খারাপ দিক আছে। কোন বিনিয়োগ আপনার জন্য ভালো হবে তা নির্ভর করছে আপনার বিনিয়োগের লক্ষ্য কী এবং আপনি কতটা ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত তার উপর। আপনি যদি কোনো ব্যবসার সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন, বেশি ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত, এবং সর্বোপরি উচ্চ মুনাফা লাভের আশা রাখেন তাহলে IPO আপনার জন্য ভালো বিকল্প হতে পারে।
তবে কোনো কোম্পানি সম্পর্কে জানতে যে অ্যানালিসিস করতে হয়, তাতে যদি আপনি দক্ষ না হন বা আপনার হাতে পর্যাপ্ত সময় না থাকে কোনো কোম্পানির সম্পর্কে বিশদে জানার, এবং আপনি তুলনামূলক কম ঝুঁকি নিয়ে কম লাভেই সন্তুষ্ট হন, তাহলে আপনার অবশ্যই FPO বাছা উচিত।






