ভারতে যখনই সুরক্ষিত বিনিয়োগের প্রসঙ্গ ওঠে তখনই সবার প্রথমে মাথায় আসে ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিটের কথা। প্রথমত এখানে একটি স্থির rate of interest-এ সুদ পেতে থাকবেন বিনিয়োগকারীরা, তাছাড়াও প্রতি বিনিয়োগকারী পিছু ইনসিওরড ডিপোজিটে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিমার সুবিধা পাওয়া যায়। ফলত এর সুরক্ষিত ও নিশ্চিত আয়ের জন্য এটি অনেক বেশি জনপ্রিয়। প্রতিটি ব্যাংক এবং NBFC-র থেকে আপনি FD করার সুবিধা পাবেন। তাছাড়াও পোস্ট অফিস থেকেও FD করা যায়। FD করার অর্থ হল অনেকটা সেভিংস অ্যাকাউন্টে টাকা রাখার মতো, তবে এখানে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকবে এবং সুদের হার সামান্য বেশি হবে। ব্যাংক আপনাকে নির্দিষ্ট সুদ প্রদান করবে এবং মেয়াদ শেষে মূল বিনিয়োগ ফেরত দেবে।
FD ৭দিন থেকে শুরু করে ১০ বছর অবধি মেয়াদে করা যায়। সাধারণত বেশিদিনের FD-র ক্ষেত্রে বেশি রিটার্ন পাওয়া যায়। তবে কিছু কিছু ব্যাংক আবার নির্দিষ্ট কয়েকটি মেয়াদে বেশি রিটার্ন দেয় এবং বেশি মেয়াদের ক্ষেত্রে সুদের হার কমিয়ে দেয়। প্রবীণ ব্যক্তিরা FD-তে কিছুটা বেশি রিটার্ন পান। আজকের আলোচনায় আমরা দেখে নেব FD থেকে কী কী সুবিধা পাওয়া যায় এবং কোন সময়ে FD বিনিয়োগ এড়িয়ে চলা উচিত।
FD-র সুবিধা: প্রথমেই দেখে নেব কেন FD-র জনপ্রিয়তা বেশি।
→ নিশ্চিত রিটার্ন: FD করার সময় ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট সংস্থা থেকে আপনাকে নির্দিষ্ট একটি সুদ প্রদান করা হয়, ফলে রিটার্নের অস্থিরতা না থাকায় ঝুঁকি কম।
→ FD অ্যামাউন্টে লোন: আপনি আপনার FD-র অর্থ লোনের জামানত হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। বেশিরভাগ ব্যাংক, FD-র 90% পর্যন্ত অ্যামাউন্টের ভিত্তিতে ঋণ দিয়ে থাকে।
→ ঝুঁকিবিহীন বিনিয়োগ: FD-র ঝুঁকি অনেক কম। শেয়ার বাজারের ভোলাটিলিটির সঙ্গে এর যোগাযোগ নেই। এমনকি RBI যদি মাঝখানে ইন্টারেস্ট রেট কমিয়েও দেয়, তারপরও আপনার FD-র রিটার্ন মেয়াদ পূরণ অবধি অপরিবর্তিত থাকবে।
→ DICGC ইনসিওরেন্স: কোনো কারণে ব্যাংক দেউলিয়া হলে DICGC অর্থাৎ Deposit Insurance and Credit Guarantee Corporation দ্বারা ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জমা অর্থ সুরক্ষিত থাকবে।
→ মেয়াদ: আপনি নিজের পছন্দ অনুযায়ী FD-র মেয়াদ নির্বাচন করতে পারেন। এমনকি যদি আপনি ভাবেন মাত্র ২-৩ মাসের জন্য রাখবেন, তাতেও সাধারণ সেভিংস অ্যাকাউন্টের তুলনায় বেশি রিটার্ন পাওয়া যাবে।
→ করমুক্ত রিটার্নের সুবিধা: আপনি যদি ৫ বছরের মেয়াদে tax saver FD-তে বিনিয়োগ করেন তাহলে রিটার্নের ওপর কোনোরকম কর দিতে হবে না আপনাকে।
FD-র একাধিক সুবিধা থাকার পাশাপাশি বেশ কিছু অসুবিধাও আছে। এবার আলোচনা করব FD-র অসুবিধাগুলি নিয়ে।
FD-র অসুবিধা:
→ কম সুদ: FD-র রিটার্ন নিশ্চিত ও সুরক্ষিত হলেও স্টক বা মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মতো আকর্ষণীয় রিটার্ন দেয় না FD।
→ স্থির সুদের হার: সুদের হার স্থির হওয়া একদিকে সুবিধার হলেও দীর্ঘমেয়াদের FD ডিপোজিটের ক্ষেত্রে মেয়াদ পূর্ণ হওয়া অবধি একই হারে সুদ মিলবে। মাঝে সুদের হার বাড়ানো হলেও বিদ্যমান FD-তে তার প্রভাব পড়বে না।
→ লক ইন: FD-র আরও একটি অসুবিধে হল এর লকইন ফিচার। এর অর্থ হল মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত আপনার অর্থ লক হয়ে থাকে এবং মেয়াদপূর্ণ হওয়ার আগে খুব জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া সেই অর্থ ব্যবহার করা যায় না। অর্থাৎ এটি লিক্যুইড নয়।
→ TDS: FD থেকে যে সুদ আয় করা হয় সেটি করযোগ্য আয় হিসেবে ধরা হয়। অর্থাৎ শুধুমাত্র tax saver FD বাদে বাকি FD-র ক্ষেত্রে রিটার্নের উপর কর দিতে হয় যা রিটার্ন কমিয়ে আনে। Fixed deposit-এর আয়কে ‘income from other sources’ ধরা হয় এবং আপনার আয়কর স্ল্যাব অনুযায়ী আপনাকে কর দিতে হয়। এছাড়াও TDS-ও কাটা হয় FD রিটার্নের ওপর।
→ মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে লড়াই করতে অক্ষম: যে-কোনো বিনিয়োগ করার আগে দেখা প্রয়োজন সেটি মুদ্রাস্ফীতির হারকে ছাপিয়ে যেতে পারবে কিনা। কিন্তু দেখা যায় FD-র সুদের হার বেশিরভাগ সময়ই মুদ্রাস্ফীতির হারের থেকে কম হয়। ফলে যদি মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে লড়াই না করতে পারে তাহলে সেই রিটার্ন বাড়তে থাকা খরচের সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে না।
→ ক্যাপিটাল গেইন নেই: আপনার মূল অর্থের বৃদ্ধি হয় না FD থেকে অর্থাৎ নির্দিষ্ট সুদ ছাড়া কোনো রকম ক্যাপিটাল গেইন নেই FD-তে।
RBI শেষবার ২০২৩ সালের জুন মাসে repo rate বাড়িয়েছিল। যার পর থেকে রেট 6.5%-এ স্থির ছিল। সেইসময় ব্যাংকগুলি FD-র রেটও বাড়িয়েছিল। কিন্তু রেপো রেট বাড়ানোর ২১ মাস পরে এখন দেখা যাচ্ছে সুদের হার সর্বোচ্চতে পৌঁছেছে। সেই কারণে মনে করা হচ্ছে অদূর ভবিষ্যতে সুদের হার কমতে পারে। যদিও বর্তমানে হার একই রাখা হয়েছে, তা সত্ত্বেও পরবর্তী মনিটারি পলিসিতে সম্ভবত রেপো রেট কমতে পারে, যা পরবর্তীতে সুদের হার কমানো জন্য দায়ী থাকবে। সেই কারণে যাঁরা সামান্য ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করতে চান এবং মুদ্রাস্ফীতিকে পাল্লা দিতে চান তারা FD বিনিয়োগের বদলে মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের কথা বিবেচনা করতে পারেন। তবে সেটি সম্পূর্ণ নির্ভর করছে আপনার বিনিয়োগ লক্ষ্য, ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা এবং ফান্ড নির্বাচনের ওপর।





