বিগত কয়েকবছরে ভারতে কর্মী ছাটাইয়ের পথে হেঁটেছে বহু সংস্থা। আর এই সংস্থাগুলির মধ্যে নাম রয়েছে স্টার্টআপ থেকে শুরু করে বড় বড় টেক জায়ান্ট, ই-কমার্স কোম্পানি এবং আরও অনেকের। এছাড়াও AI-এর বাড়বাড়ন্তও দায়ী বহু চাকরি ছাটাইয়ের পেছনে। এমতাবস্থায় আমাদের প্রত্যেকেরই নিজেদের আর্থিক দিক সম্পর্কে সচেতন থাকা উচিত এবং সময়ে সময়ে রিভিউ করা উচিত যাতে বেকারত্বের ঝড়ঝাপ্টা সামলে চলা যায়। সঠিক ফিনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্টের ফলে বেকারত্বের মতো কঠিন সময় কীভাবে কাটিয়ে উঠবেন তারই কিছু উপায় জেনে নেব।
→ Emergency fund তৈরি রাখুন: নিয়মিত বেতনের পথ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে emergency fund সেইসময় ব্যাকআপের কাজ করে যাতে সেই মুহূর্তে চলতে থাকা ইনভেস্টমেন্টগুলির উপর চাপ না পড়ে। কীভাবে বানাবেন emergency fund? Thumb rule অনুযায়ী ৬ মাসের খরচ এমারজেন্সি ফান্ড হিসাবে রাখা উচিত। কারণ দৈনন্দিন খরচ মেটানো হোক বা EMI পেমেন্ট হোক, এই ধরনের অনিবার্য খরচগুলির জন্য এমারজেন্সি ফান্ড একান্তই প্রয়োজনীয়। Emergency fund পরিকল্পিত খরচ মেটানোর জন্য একেবারেই ব্যবহার করা উচিত নয়, বরং আপদকালীন পরিস্থিতিতে এই ধরনের ফান্ড একপ্রকার রক্ষাকবচের কাজ করে। চাকরি ছাটাইয়ের সময় যদি আপনার নিয়োগকর্তা ২-৩ মাসের কোনোরকম compensation money দিয়ে থাকে সেই পুরো টাকাই emergency fund-এ রেখে দিন। এবার মনে প্রশ্ন আসতেই পারে এমারজেন্সি ফান্ড রাখবেন কোথায়? Emergency fund রাখার সবচেয়ে জায়গা হল sweep in FD অথবা liquid mutual fund।
→ বাজেট তৈরি করুন: এরপর দেখতে হবে আর্থিক দিক থেকে আপনি কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন। আপনার সমস্ত অ্যাসেট, লায়াবিলিটি, সমস্ত খরচ, আয় ইত্যাদির একটা তালিকা তৈরি করুন। এর ফলে আপনি নিজেই বুঝতে পারেন আপনার আর্থিক পরিস্থিতি বর্তমানে কেমন এবং সেই অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারবেন। এরপর প্রয়োজন সঠিক বাজেট তৈরি করা। তার জন্য প্রয়োজন নিজের আয় ও ব্যয়ের হিসেব তৈরি করা। প্রথমেই আয়ের উৎস কী কী সেগুলি লিখে ফেলুন যেমন–– rent, dividend, deposit-এর উপর interest ইত্যাদি। এরপর খরচগুলি লিখে ফেলুন। একমাসের যাবতীয় খরচ, তা মুদির দোকানের খরচ হোক বা ইলেকট্রিক বিল, EMI-এর খরচ হোক অথবা ওষুধের খরচ–– সবকটির তালিকা তৈরি করুন। খরচের তালিকা করার সময় প্রয়োজনীয় খরচ ও তুলনায় কম প্রয়োজনীয় খরচের আলাদা তালিকা রাখুন। অপ্রয়োজনীয় খরচ কমাতে বাজেট মেনে চলুন। তবে মনে রাখবেন বিনিয়োগের জন্য অর্থ সবসময় আলাদা করে রাখবেন এবং বিনিয়োগের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ রয়েছে তার থেকে কোনোরকম অর্থ এইধরনের খরচের জন্য ব্যবহার করবেন না। মনে রাখবেন, নতুন চাকরি পাওয়ার আগে যতই অর্থকষ্ট হোক না কেন নিজের investmentগুলি মাঝ পথে ছেড়ে দেবেন না কারণ দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য পূরণে সেই বিনিয়োগগুলিই সাহায্য করবে। তবে যদি একান্তই বিনিয়োগ থেকে বের হয়ে আসতে হয় তাহলে অবশ্যই ব্যাংক FD, debt mutual fund-এই দুটি বিনিয়োগ চালিয়ে যান এবং অন্যান্য বিনিয়োগ থেকে আংশিকভাবে টাকা withdrawal করুন। তবে ইনসিওরেন্স প্রিমিয়াম একেবারেই বন্ধ করবেন না।
→ Loan EMI: বেকারত্বের সময়ে লোনের EMI শোধ করা ব্যাপক দুশ্চিন্তার একটি কাজ। কারণ EMI যদি আপনি বন্ধ করেন বা দেরিতে pay করেন তাহলে আপনার সিবিল স্কোরে তার প্রভাব পড়বে এবং স্কোর কমে আসবে। সেইজন্য আপনি জরুরি পরিস্থিতিতে EMI-এর পরিমাণ কমিয়ে tenure বা সময়সীমা বাড়িয়ে দিতে পারেন। যদিও এটা ঠিক, সময়সীমা বা লোনের মেয়াদ বাড়ালে আপনাকে বেশি পরিমাণে সুদ বা interest দিতে হবে। তবে আপনার আর্থিক পরিস্থিতি একবার ঠিক হয়ে গেলে অবশ্যই EMI-এর পরিমাণ আগের মতো করে নিতে ভুলবেন না।
→ বিচক্ষণতার সঙ্গে credit card-এর ব্যবহার: আর্থিক প্রয়োজনে credit card-এর ব্যবহার বা ব্যক্তিগত ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা মাথায় আসতে পারে। তবে এই ধরনের ঋণ বা ধারের থেকে সাবধান থাকা উচিত। যদি আপনি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে থাকেন তাহলে খুব বুঝেশুনে খরচ করুন। Credit card বিল যদি বাকি থাকে তাহলে সেই কার্ড ব্যবহার করে নতুন কিছু কেনা থেকে বিরত থাকুন। আগামী ১-২ মাসের মধ্যে ক্রেডিট কার্ডের সমস্ত বিল পরিশোধ করুন। আর মনে রাখবেন, শুধুমাত্র minimum balance-টুকু পরিশোধ করলেই হবে না। কারণ এতে আপনাকে 36% p.a. ইন্টারেস্ট তো দিতেই হবে, তাছাড়াও নতুন কেনাকাটাতেও ৪৫ দিন থেকে ৫১ দিনের interest free মেয়াদ আপনি পাবেন না।
→ Freelance বা পার্টটাইম কাজের সন্ধান: নতুন চাকরির সন্ধানের পাশাপাশি freelancing বা part time কাজের সন্ধান চালিয়ে যান। কারণ এই বিকল্পগুলিই সেইসময়ে আয় করতে সাহায্য করবে।
→ নিজেকে upskill করা: এই সময়টায় অবশ্যই নিজেকে upskill করুন। অনলাইন কোনো কোর্স, কোনো ট্রেনিং ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ করুন যাতে নতুন চাকরির ক্ষেত্রে আপনার সুযোগ বৃদ্ধি পায়। চাকরির প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নিজেকে প্রাসঙ্গিক রাখতে অবশ্যই নিজের দক্ষতা বাড়ান।
→ স্বাস্থ্যবিমা: আপনার চাকরি হাতছাড়া হওয়ার সাথে সাথেই কোম্পানির বিমাও বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে যতদিন আপনি নতুন চাকরি পাচ্ছেন না ততদিন আপনি কোনোরকম স্বাস্থ্যবিমার অধীনে কভার থাকবেন না। সেই কারণে এই সময় আপনার প্রয়োজন নিজস্ব একটি স্বাস্থ্যবিমা। আপনি আপনার শহরের চিকিৎসাজনিত খরচ ও পরিবারের সদস্য সংখ্যার উপর ভিত্তি করে ৫ লাখ পর্যন্ত বিমা অবশ্যই করিয়ে রাখুন।
শেষে আমরা বলতে পারি কর্মচ্যুতি বা সাময়িক বেকারত্বের সময়ে আপনি কতটা দক্ষতার সঙ্গে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামলাচ্ছেন সেটি বিশেষ জরুরি। এই সময় সঠিক নিয়মানুবর্তিতা ও বিচক্ষণ পরিকল্পনার মাধ্যমে চললে আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকে। মনে রাখা দরকার যে এই পরিস্থিতি হল সাময়িক, আপনি আর্থিক সিদ্ধান্তগুলি কীভাবে নিচ্ছেন এবং প্রতিবন্ধকতাগুলি কীভাবে কাটাচ্ছেন সেটিই বিবেচ্য।





