বাড়ি তৈরির জন্য অনেকেই ঋণের উপর ভরসা করেন এবং সেই কারণে বর্তমানে গৃহঋণের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু কোনোভাবে যদি লোনের EMI অর্থাৎ Equated Monthly Installment প্রদানে দেরি হয় বা কোনো মাসে না দিয়ে ওঠা হয় তাহলে তার ফলাফল চিন্তার হতে পারে। হোম লোন বা গৃহঋণ হল একটি দীর্ঘমেয়াদি দায়বদ্ধতা যেখানে নিয়মিত repayment প্রয়োজন, যাতে আপনার বাড়ির সুরক্ষা নিশ্চিত থাকে এবং আপনার ভালো আর্থিক পরিস্থিতি বজায় থাকে। আজকে আমরা জেনে নেব গৃহঋণের EMI প্রদানে দেরি হলে বা না দেওয়া হলে কী হতে পারে এবং তার থেকে বাঁচার উপায় কী?
প্রথমেই দেখে নিই লেট পেমেন্ট বা ফেলড্ পেমেন্টের ক্ষেত্রে কী কী হতে পারে––
→ দেরিতে পেমেন্টের জন্য জরিমানা: বেশিরভাগ ঋণদাতা নির্দিষ্ট দিনের পরে পেমেন্টের জন্য একটি জরিমানা ধার্য করে। জরিমানার পরিমাণ আলাদা হয়, তবে সাধারণত বাকি থাকা অ্যামাউন্টের উপর নির্দিষ্ট হারে বা নির্দিষ্ট পরিমাণে পেনাল্টি কাটা হয়। যেমন প্রতি মাসে outstanding অর্থাৎ বাকি থাকা EMI-এর উপর 2% থেকে 3% জরিমানা ধার্য করা হতে পারে। ফলে এই পেনাল্টির কারণে আপনার মোট ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাবে।
→ ক্রেডিট স্কোরে প্রভাব: EMI-এর পেমেন্ট দেরি হলে সবচেয়ে খারাপ প্রভাব পড়ে credit স্কোরের ওপর। যেহেতু ঋণ একটি দীর্ঘমেয়াদের দায়বদ্ধতা, তাই নিয়মিত যদি তার পেমেন্টে দেরি হয় তাহলে আপনার ক্রেডিট স্কোর ধীরে ধীরে কমতে থাকবে। আর ক্রেডিট স্কোর কমে গেলে আপনি ভবিষ্যতে কোনো প্রয়োজনে নতুন লোন বা ক্রেডিট কার্ড পাবেন না, এমনকি নিজের চাহিদামতো সুদের হারের থেকেও বঞ্চিত হবেন। CIBIL সংস্থা প্রত্যেক ব্যক্তির নেওয়া ঋণের পরিবর্তে স্কোর প্রদান করে। আপনি কোনো EMI প্রদানে দেরি করলে বা ব্যর্থ হলে ব্যাংক সেই রিপোর্ট ক্রেডিট ব্যুরোকে পাঠায় যা আপনার ক্রেডিট হিস্ট্রি নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট।
→ জমা হতে থাকা সুদ: যখন আপনি কোনো EMI প্রদানে ব্যর্থ হন তখন বাকি থাকা অর্থ আপনার মূল অর্থের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে এবং তার উপর সুদ জমতে থাকে। অর্থাৎ EMI প্রদানে ব্যর্থ হলে সেটি আপনার লোনের পরিমাণ বাড়াতে থাকে, ফলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধ করা দুষ্কর হয়ে ওঠে।
→ ঋণদাতার কাছ থেকে নোটিশ: একাধিক EMI প্রদানে ব্যর্থ হলে ঋণদাতার কাছ থেকে ডিফল্টের নোটিশ পাঠানো হবে। নোটিশে আউটস্ট্যান্ডিং অ্যামাউন্ট সম্পর্কে বলা থাকবে এবং পরবর্তীতে আরও দেরি হলে তার ফলাফল সম্পর্কেও জানানো হয়। ঋণদাতার করা এই পদক্ষেপগুলি যদি আপনি এড়িয়ে যান তাহলে তারা পরবর্তীতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে।
→ আইনি পদক্ষেপ: ৬ মাস ধরে যদি এইভাবেই EMI না দেওয়া হয় তাহলে আপনাকে প্রদান করা ঋণ ব্যাংক NP বা non-performing হিসেবে গণ্য করবে অর্থাৎ তারা ধরে নেবে আপনি ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ। সেক্ষেত্রে ব্যাংক আইনি ব্যবস্থা নিয়ে বাকি অর্থ ফেরত নিতে পারে। এছাড়াও গৃহঋণের ক্ষেত্রে যেহেতু প্রপার্টি সিকিউরিটি হিসাবে থাকে, তাই সেই প্রপার্টি অর্থাৎ আপনার অ্যাসেট, এইক্ষেত্রে আপনার বাড়ি, বাজেয়াপ্ত করতে পারে ব্যাংক।
→ ঋণ পেতে সমস্যা: আমরা আগে দেখলাম যে EMI দিতে ব্যর্থ হলে আপনার ক্রেডিট স্কোরের উপরে তার নেগেটিভ প্রভাব পড়ে ও স্কোর কমে যায়। আর এর ফলে নতুনভাবে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে। যদি ব্যাংক আপনাকে একজন ঝুঁকিপূর্ণ ঋণগ্রহীতা হিসেবে ধরে নেয় তাহলে পরবর্তীতে ঋণ নেওয়ার সময় আপনাকে বেশি সুদ দিতে হতে পারে বা এমন হতে পারে আপনার ঋণের আবেদন বাতিল হয়ে গেল।
→ ঋণের সময়সীমা বাড়ানো: কিছু ক্ষেত্রে EMI-এর বোঝা কমাতে কোনো কোনো ব্যাংক লোন পরিশোধের সময়সীমা বাড়াতে পারে। এটি সাময়িকভাবে স্বস্তির কারণ হলেও, এতে সম্পূর্ণ লোনের উপর মোট সুদের পরিমাণ বেড়ে যায়।
এবার দেখে নেওয়া যাক EMI প্রদানে দেরি হলে কী করা যেতে পারে––
- আপনি যদি সাময়িক কোনো আর্থিক অসুবিধার সম্মুখীন হন তাহলে বেশিরভাগ ঋণদাতা EMI পেমেন্টের একটি গ্রেস পিরিয়ড দিয়ে থাকে। ফলে তেমন কোনো পরিস্থিতি এলে সরাসরি ব্যাংকে কথা বলুন ও আপনার পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত করুন।
- যদি আর্থিক সংকটের কারণে আপনি EMI প্রদানে ব্যর্থ হন তাহলে ব্যাংককে জানান, যদি তারা ঋণের সময়সীমা বাড়িয়ে সাময়িকভাবে EMI-এর পরিমাণ কমাতে পারে। তবে মনে রাখবেন আর্থিক সংকট মিটে গেলে পুনরায় ঋণের EMI-এর পরিমাণ আগের মতো করতে ভুলবেন না।
- যদি আপনার ১টি বা ২টি পেমেন্ট বাদ পড়ে থাকে, তাহলে চেষ্টা করুন বাকি থাকা EMI গুলি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মিটিয়ে দেওয়ার যাতে আইনি ব্যবস্থা বা জরিমানার মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন না হতে হয়।
এক বা দুটি EMI বাদ পড়ে গেলে বিশাল কোনো প্রভাব পড়বে না ঠিকই তবে এই জিনিস বারংবার হতে থাকলে আপনার credit score, আর্থিক পরিস্থিতির উপর খারাপ প্রভাব পড়বে, এমনকি আপনার সম্পদহানিও হতে পারে। তাই গৃহঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে সচেতন থাকুন এবং আর্থিক কোনো সমস্যা দেখা দিলে ব্যাংকে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের অবগত করুন।





