Article By – সুনন্দা সেন

ভারত এই সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য জগতে নিজস্ব অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে বড় ধরনের কূটনৈতিক ও নীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, মার্কিন শুল্কনীতি এবং তেলের বাজারে অস্থিরতার মধ্যে ভারত স্পষ্টভাবে তার বাজার–বৈচিত্র্যের কৌশলকে দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগ হলো রাশিয়া-নেতৃত্বাধীন ইউরেশিয়ান ইকোনমিক ইউনিয়ন (EAEU)–এর সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হওয়া। রাশিয়া, আর্মেনিয়া, বেলারুশ, কাজাখস্তান ও কিরগিজস্তানকে নিয়ে গঠিত এই জোটের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য গত কয়েক বছরে দ্রুত বেড়েছে। ২০২১ সালে যেখানে মাত্র ২,০০০ ভারতীয় কোম্পানি রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা করত, এখন সেই সংখ্যা ১০,০০০-এর বেশি। দুই পক্ষই ২০৩০ সালের মধ্যে বাণিজ্যকে ১০০ বিলিয়ন ডলার–এ উন্নীত করার লক্ষ্য স্থির করেছে।
কৃষি–পণ্য, সামুদ্রিক রপ্তানি, ফার্মাসিউটিক্যালস, টেক্সটাইল, কেমিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যের জন্য রাশিয়া ও EAEU বাজারে ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই আলোচনার অংশ হিসেবে ভারত ও EAEU দেশগুলো প্রতি তিন মাসে রেগুলেটরি বৈঠক করবে। যাতে সনদ, পরীক্ষার মান, মাননিয়ন্ত্রণ, স্যানিটারি ফাইটোস্যানিটারি নিয়মসহ যেসব নন–ট্যারিফ বাধা রপ্তানিকে ধীর করে, তা দ্রুত সমাধান করা যায়। বিশেষত কৃষিজ ও সামুদ্রিক পণ্যে ভারতীয় রপ্তানিকারকরা বারবার ইউরেশিয়ান অঞ্চলে জটিল সার্টিফিকেশন সমস্যার মুখে পড়ছিল, এই উদ্যোগ সেই পথ অনেক সহজ করবে। এদিকে ভারতের বৃহত্তর বৈদেশিক বাণিজ্য কৌশলও নতুন গতি পাচ্ছে। ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার সঙ্গে ভারতের একাধিক FTA আলোচনাও একসঙ্গে চলছে। রপ্তানিকারকদের মধ্যে এসব চুক্তির ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সার্টিফিকেট অব অরিজিন–এর ইস্যু সংখ্যা গত অর্থবছর থেকে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গুরুত্ব দিয়ে শুরু করেছে গ্লোবাল নন–ট্যারিফ মেজার (NTM)–এর ম্যাপিং কাজ। বিদেশি বাজারে কোন দেশে কোন ধরনের পরীক্ষার মান, লেবেলিং নিয়ম, নিরাপত্তার শর্ত বা অডিট প্রক্রিয়া পণ্য রপ্তানিতে বাধা সৃষ্টি করছে—তার একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেস তৈরি হচ্ছে। এই তথ্য দিয়ে সরকার ভবিষ্যতে রপ্তানিকারকদের জন্য নির্দেশিকা, সুবিধা এবং দ্রুত সমাধান ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। শুধু রপ্তানি নয়, আমদানির ক্ষেত্রেও ভারত কৌশলগত পরিবর্তন আনছে। তেলের ক্ষেত্রে রাশিয়ার উপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমানো হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনায় জ্বালানি–নির্ভরতা নিয়ে যে অস্বস্তি ছিল, তা কমাতে ভারত এখন বিকল্প উৎস থেকে ক্রুড অয়েল ও LPG আমদানির পথ বাড়াচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বৃহত্তর বাণিজ্য চুক্তির পথকে সহজ করতে পারে। সব মিলিয়ে, ভারতের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও ভারত দ্রুত নতুন রপ্তানি–বাজার, নতুন বাণিজ্য–অংশীদার এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।




