যে-কোনো দেশে যখন বাজেট পেশ করা হয়, তখন দেশের অর্থনৈতিক দিক সাধারণের সামনে তুলে ধরা হয়। দেশটির আয়-ব্যয়ের হিসাব, জমা খরচ সব বাজেটে বলা হয়। বাজেটের সেইরকমই একটি টার্ম হল fiscal deficit যা বাজেট পেশ করার সময়ে জানানো হয়। তবে জানেন কি এই জিনিসটি আসলে কী? চলুন বিস্তারিত জানা যাক fiscal deficit সম্পর্কে।
যখন কোনো সরকারের মোট আয়ের তুলনায় মোট ব্যয় বেশি হয়ে যায় তখন সেই পরিস্থিতিতেই fiscal deficit বলে। সরকার এই fiscal deficit-কে পূর্ণ সংখ্যায় বা দেশের জিডিপির percentage হিসেবে দেখাতে পারে। এবার এই টার্মটি সম্পর্কে বিশদে জানা যাক। –
Fiscal deficit
আগেই বলা হয়েছে সরকারের মোট revenue বা আয়ের তুলনায় খরচ যখন বেশি হয়ে যায়, তখন তাকে fiscal deficit বলে। সেই সময় সরকার আয়-ব্যয়ের মধ্যে পার্থক্য কমাতে এবং এই ঘাটতি মেটাতে ঋণ নেয়। সাধারণত সরকার যখন অর্থনৈতিক পরিকাঠামো উন্নত করে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি বিভাগে বিনিয়োগ বাড়ায় তখন এই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। একইভাবে কর কমিয়ে আনা বা অর্থনীতির সামগ্রিক পতনের কারণে সরকারের revenue বা আয় কমে এলে সরকার অর্থ ঋণ নেয়। এই ঘাটতিগুলি মেটাতে হয় সরকার, বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে capital market থেকে ঋণ নেয় নয়তো সেন্ট্রাল ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়। যদিও ঠিক কী কারণে fiscal deficit হয়েছে সেটি বুঝতে অর্থনীতিবিদরা সরকারের খরচগুলি দেখেন। যদি অনেক বেশি সময় ধরে deficit বা ঘাটাতি চলতে থাকে তাহলে সরকারের পক্ষে খরচ চালিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না, যার কারণে মুদ্রাস্ফীতি, ঋণ নেওয়া ইত্যাদি ঘটনা ঘটতে পারে।
কীভাবে fiscal deficit ক্যালকুলেট করা হয়?
সরকারের মোট আয় থেকে মোট ব্যয় বাদ দিয়ে fiscal deficit গণনা করা হয়।
Fiscal deficit = সরকারের মোট খরচ (মূলধনী ব্যয় ও রাজস্ব ব্যয়) – মোট আয় (রেভিনিউ ও নন-রেভিনিউ রিসিট, ঋণ পুনরুদ্ধার ইত্যাদি)
Fiscal deficit-এর কারণ কী?
মূলত, দেশের পরিকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক কল্যাণ প্রকল্প ইত্যাদি কারণে সরকার ঋণ নিয়ে থাকে। এছাড়াও একাধিক কারণে fiscal deficit হতে পারে –
1. Tax revenue কমে যাওয়া: মন্দা বা কর কমানোর কারণে কর থেকে প্রাপ্ত আয় কমে যায়, যা সরকারের মোট আয় কমিয়ে দেয়।
2. অর্থনৈতিক মন্দা: মন্দার সময়ে সরকারের মোট আয় কমে যায়। যদিও সামাজিক প্রকল্পগুলি অব্যাহত থাকার কারণে সেই হারে খরচ কমে না, যার জন্য ঘাটতি তৈরি হয়।
3. অপ্রত্যাশিত ঘটনা: প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ বিগ্রহ, অতিমারি-মহামারির মতো অপ্রত্যাশিত ঘটনায় সরকারের অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হয়, যা ঘাটতির জন্য দায়ী।
4. ঋণের সুদ: যদি ঋণের পরিমাণ বিশাল হয়, তাহলে সরকারকে বেশি সুদ প্রদান করতে হয়, যার জন্য deficit ঘটে।
কীভাবে এই ঘাটতি পূরণ করা যায়?
1. অর্থ ঋণ: Fiscal deficit সাধারণত ঋণ নিয়ে মেটানো হয়। ভারত সরকারের এই ধরনের ঘাটতি দেখা দিলে সরকার PSU ব্যাংক, ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক, বিদেশি ব্যাংক কিংবা সাধারণ মানুষের থেকে অর্থ ঋণ নিয়ে মেটায়।
2. Taxation: সরকার revenue বাড়তে বেশ কিছু পণ্য ও পরিবেষার উপর কর বাড়িয়ে দেয়। এতে যেহেতু সরকারের কাছে অর্থ আসে তাই ঘাটতি কিছুটা কমে।
3. খরচে লাগাম: Fiscal deficit কমাতে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প এবং কার্যক্রমের খরচ কমিয়ে আনে। যেমন সাবসিডি বন্ধ করা বা সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা কমানো ইত্যাদি।
4. সরকারি ও বেসরকারি মেলবন্ধন: আয় বাড়াতে এবং খরচ কমাতে সরকার বেসরকারি অংশীদারিত্ব বাড়ায়। যেমন কোনো পরিকাঠামো প্রকল্পে বেসরকারি কোম্পানির বিনিয়োগ ইত্যাদি।
5. বিনিয়োগ কমানো: বেসরকারি ক্ষেত্রে সরকারের যা লগ্নি রয়েছে সেগুলো থেকে হয় বিনিয়োগ কম করে বা বিক্রি করে দিয়ে সরকার অর্থ সংগ্রহ করে।
6. মনিটারি পলিসি: ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকও fiscal deficit নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা নিয়ে থাকে। রিজার্ভ ব্যাংক অর্থনীতিতে অর্থের যোগানের উপর রাশ টেনে মুদ্রাস্ফীতি এবং সুদের হার কম রাখার চেষ্টা করে, যা পরোক্ষভাবে fiscal deficit কমায়।
কীভাবে সরকার fiscal deficit-এর ভারসাম্য বজায় রাখে?
আমরা ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছি যে সরকার এই ধরনের ঘাটতির ভারসাম্য বজায় রাখতে বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে বিভিন্ন ভারতীয় ব্যাংকের থেকে অর্থ ধার করে। ব্যাংকগুলি এই বন্ড কিনে সেইসব বিনিয়োগকারীদের বিক্রি করে যাঁরা সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ আগ্রহী। বিনিয়োগকারীদের এই বন্ডের প্রতি আকর্ষণের কারণ হল সাধারণত সরকার ঋণ পরিশোধে বা সুদ প্রদানে ব্যর্থ হয় না। ফলে এটিকে অন্যতম সুরক্ষিত একটি বিনিয়োগ ধরা হয়।
অতিরিক্ত সুদের আশায় বিনিয়োগকারীরা এইরকম বন্ডে বিনিয়োগ করে এবং মেয়াদ শেষে মূল অর্থ ফেরত পায়। পরিশেষে এটাই বলা যায় যে, যে-কোনো দেশের ক্ষেত্রে দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে ও স্থিরতা বজায় রাখতে fiscal deficit নিয়ন্ত্রণে রাখা খুব জরুরি।





