ভারতের শেয়ার বাজার যেমন প্রচুর আর্থিক লাভের সম্ভাবনা সামনে আনে, সেই সঙ্গে ভারতীয় শেয়ার বাজারের এমন ইতিহাসও রয়েছে যখন বাজার এমনভাবে ক্র্যাশ করেছে যেখানে বিনিয়োগকারীরা কোটি কোটি টাকার ক্ষতি তো করেছেনই, আবার অনেকে সেই ক্র্যাশ থেকে শিক্ষা নিয়ে ভুলেও পরবর্তীতে আর শেয়ার বাজারমুখো হননি। এই ধরনের মার্কেট ক্র্যাশ যেমন মানুষের অর্থ ও দেশের সার্বিক অর্থনীতির ক্ষতি করে, পাশাপাশি আমাদের মতো বিনিয়োগকারীদের অনেক কিছু শেখায়ও বটে। আজকের এই ব্লগে আমরা অতীতেরই এমন ৫ টি বড় স্টক মার্কেট ক্র্যাশ সম্পর্কে আপনাদের জানাব। তাহলে দেখে নেওয়া যাক অতীতের এই বাজারের পতন আমাদের ভবিষ্যতে কী কী শেখাল। তবে তার আগে সাম্প্রতিকতম ক্র্যাশের ঘটনার সামান্য উল্লেখ না করলেই নয়। সেটা হল 4 জুন, 2024।
4th June 2024: 4 জুন, 2024 ভারতীয় শেয়ার বাজার ব্যাপক পতনের সাক্ষী থেকেছে। সেনসেক্স ও নিফটি দুটি সূচকই ওইদিন ব্যাপক হারে পড়েছিল। সেনসেক্স 1.23% পড়ে, 72761 পয়েন্টে বন্ধ হয়েছিল ও Nifty 50 1.51% পড়ে 21997 পয়েন্টে বন্ধ হয়েছিল। এবং তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে তার আগের দিন বাজার ছিল বেশ চাঙ্গা। 3 জুনের বাজার ছিল 2021 সালের জানুয়ারির পর সবচেয়ে বড় single-day rally। কিন্তু তার পরদিনই মার্কেট এমনভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে যে BSE-তে লিস্টেড কোম্পানিগুলোর collective market cap প্রায় 44 লাখ কোটি টাকা কমে যায়। আর এর কারণ ছিল লোকসভা ইলেকশন রেজাল্ট, 2024। রেজাল্টের আগে এক্সিট পোল প্রত্যাশা করেছিল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজেপি সমর্থিত NDA জোট জিতবে যেটা রেজাল্টে প্রতিফলিত হয়নি। আর এর ফলস্বরূপ মার্কেট প্রচণ্ড পরিমাণে পতনের সম্মুখীন হয়।
চলুন এবার তাহলে ইতিহাস ঘেঁটে ৫টি বড় ভারতীয় শেয়ার মার্কেট ক্র্যাশের বিষয়ে আপনাদের জানানো যাক –
- ১৯৯২ সালের মার্কেট ক্র্যাশ: ১৯৯২ সালের বাজার ধস সম্ভবত এখনও পর্যন্ত বহুল চর্চিত ও কুখ্যাত একটি ঘটনা। এটিই ছিল ভারতীয় স্টক মার্কেটের সবচেয়ে বড়ো জালিয়াতি যা প্রায় ৫০০০ কোটি টাকা ছুয়েছিল। বর্তমানে মূল্যবৃদ্ধির বাজারে যা প্রায় ৩৫ হাজার কোটির সমান। ৯২-এর এই মার্কেট ক্র্যাশ ‘The Harshad Mehta Scam’ নামেই বেশি পরিচিত। হরশাদ মেহতা নামের এই স্টক ব্রোকার ব্যাংকের থেকে অর্থ ধার নিয়ে বিভিন্নভাবে স্টকের দামের ম্যানিপুলেশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। যখন এই স্ক্যামের খবর সামনে আসে সেইসময় বাজার ব্যাপকভাবে পড়ে এবং ইনভেস্টররা বাজারের উপর ভরসা হারিয়ে ফেলেন। এত বড় জালিয়াতির কারণে পরবর্তী প্রায় ২ বছর ধরে শেয়ার বাজার bearish ছিল।
- 2000 সালের Dotcom Bubble Burst: ৯০-এর শেষের দিকে যে dotcom revolution শুরু করেছিল, যে bubble তৈরি হয়েছিল সেটা 2000 সাল আসতে আসতে ধসে যায়, এবং সারা বিশ্বের পাশাপাশি ভারতীয় টেক স্টকে bubble তৈরি হওয়ার ফলে যেভাবে overvalued হয়ে গিয়েছিল সেগুলোও পতনের মুখ দেখে। ভারতীয় দুই সূচক সেনসেক্স ও নিফটি 50 ভীষণভাবে ক্র্যাশ করে এবং বাজারের প্রচুর আর্থিক ক্ষতি হয়।
- ২০০৮-এর বৈশ্বিক সংকট: ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট, স্টক মার্কেটের পাশাপাশি অর্থনীতি ও ব্যবসার উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। ২০০৮ সালের ২১ জানুয়ারি Sensex প্রায় ১৪০৮ পয়েন্ট পড়েছিল ও বিনিয়োগকারীদের সম্পদ ব্যাপকভাবে ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছিল। ২০০৮-এর ২১ জানুয়ারিকে ‘Black Monday’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আমেরিকার মার্কেটে মন্দার পাশাপাশি আরও বেশ কয়েকটি কারণে ওই বছর মার্কেট ক্র্যাশ করেছিল যেমন –
- আমেরিকায় সুদের হার কমে যাওয়া।
- বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের বাজারের প্রতি মনোভাব পরিবর্তন।
- কমোডিটি মার্কেটের অস্থিরতা।
- FII অর্থাৎ Foreign Institutional Investors ও Hedge Fundগুলির নতুন প্রতিষ্ঠিত মার্কেটের শেয়ারগুলি বিক্রি করা ও অপেক্ষাকৃত স্থায়ী উন্নত মার্কেটে বিনিয়োগ করা।
২০০৮ সালের শেষে Sensex ২০৪৬৫ point থেকে কমে ৯৭১৬ পয়েন্টে নেমে আসে। তারপর দুবছর পর ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে মার্কেট আবার নিজের পুরোনো অবস্থায় ধীরে ধীরে ফিরে আসে।
- ২০১৬ সালের স্টক মার্কেট ক্র্যাশ : ২০১৫-১৬ সময়টি বিশ্বব্যাপী শেয়ার মার্কেটের জন্য একটি কঠিন সময় ছিল। ভারতে সেনসেক্সের পতন অব্যাহত ছিল। ২০১৬ সালের প্রথম দিকে ১১ মাসের মধ্যে সেনসেক্স ২৬%-এর বেশি পড়ে গিয়েছিল। কোনো একটি ঘটনা নয়, বরং একাধিক ঘটনা এর জন্য দায়ী ছিল, যেমন ব্যাংকগুলিতে নন-পারফর্মিং অ্যাসেট অর্থাৎ NPA বেড়ে যাওয়া, অপরিশোধিত তেলের দাম কমে যাওয়া, চীনের অর্থনৈতিক মন্দা, সারা বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীদের মার্কেটের প্রতি বিশ্বাসের অভাব ও বিশ্বব্যাপী আর্থিক দুর্বলতা।
এছাড়াও নভেম্বর ২০১৬ সালে ভারতে ডিমনিটাইজেশনের ঘোষণায় সেই বছর আবার মার্কেট ক্র্যাশ করে। Sensex ৬% ও Nifty ৫৪১ পয়েন্ট পড়ে যায়। ডিমনিটাইজেশনের ঘোষণার পাশাপাশি আমেরিকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও অন্যান্য এশিয়ান স্টক মার্কেট যেমন – Nikkei, Shanghai Composite-এর একইসঙ্গে পতন ভারতে মার্কেট ক্র্যাশের জন্য দায়ী ছিল।
- ২০২০ সালে মার্কেট ক্র্যাশ : ২০২০ সালের স্টক মার্কেট ক্র্যাশ সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে বড়ো পতন, এবং এর জন্য সম্পূর্ণভাবে করোনা ভাইরাসের অতিমারিকেই দায়ী করা যায়, যার উৎপত্তি স্থল ছিল চীন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাকে অতিমারি ঘোষণা করে দেওয়ার দিন থেকেই সেনসেক্স ৪২,২৭৩ point থেকে ১ সপ্তাহের মধ্যে ২৮,২৮৮ পয়েন্টে চলে আসে। অতিমারিতে স্টক মার্কেটের টালমাটাল অবস্থার পাশাপাশি Yes Bank-এর আর্থিক সংকটের খবরে বহু বিনিয়োগকারীকে লোকসানের মধ্যে পড়তে হয়। অতিমারির জন্য সমগ্র বিশ্বের স্টক মার্কেটগুলিতে পতন দেখা দিলেও সেই পরিস্থিতি থেকে মার্কেট খুব তাড়াতাড়ি বের হয়েও এসেছিল।
সুতরাং আলোচনা থেকে দেখা গেল আর্থিক মন্দা, কোনো ধরনের স্ক্যাম, বৈশ্বিক কোনো ঘটনা, কোনো অতিমারি বা যে-কোনো স্পেকুলেশন ইত্যাদি বিভিন্ন কারণ মার্কেট ক্র্যাশের জন্য দায়ী। তবে ইতিহাস দেখলে এও বোঝা যায় যে মার্কেট ক্র্যাশ করার পর আবার পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরতেও খুব বেশি সময় লাগে না। সুতরাং এই ধরনের তাৎক্ষণিক ঘটনায় চিন্তিত না হয়ে যদি আপনি সঠিক শেয়ার কিনে থাকেন, কোম্পানির ফান্ডামেন্টাল বুঝে থাকেন তাহলে long-term-এর জন্য অবশ্যই শেয়ার হোল্ড করুন।




