বিনিয়োগকারীদের বেশ কিছু সুবিধা প্রদানের কারণে মিউচ্যুয়াল ফান্ড গত কয়েক বছরে ভারতে বেশ চাহিদা তৈরি করতে পেরেছে। মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ভালো রিটার্নের কারণে অনেক বিনিয়োগকারীর পছন্দের একটি বিনিয়োগ হয়ে উঠেছে এটি। আমাদের দীর্ঘমেয়াদের সম্পদ গঠনে মিউচ্যুয়াল ফান্ড সাহায্য করে, তা-ও আবার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতি বা ইনফ্লেশনের প্রভাব যাতে আমাদের সম্পদ তৈরিতে না পড়ে সেই বিষয়টির ওপর লক্ষ রেখে। যেহেতু আমাদের বিনিয়োগ পোর্টফোলিওর একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে মিউচ্যুয়াল ফান্ডে, তাই আমাদের জানতে হবে কোথায় বিনিয়োগ করব বা কীভাবে বিনিয়োগ করলে পছন্দমতো পোর্টফোলিও বানানো সম্ভব হবে। আজ আমরা সেইজন্য মিউচ্যুয়াল ফান্ডের দুটি sub-category মাল্টি ক্যাপ ফান্ড ও ফ্লেক্সি ক্যাপ ফান্ড সম্পর্কে জানব।
Multi cap fund :
মাল্টি ক্যাপ ফান্ড নিজেদের corpus ইক্যুইটি ও ইক্যুইটি-সম্বন্ধীয় স্টকে বিনিয়োগ করে এবং নাম থেকেই ধারণা পাওয়া যাচ্ছে এটি মাল্টি অর্থাৎ লার্জ ক্যাপ, মিড ক্যাপ ও স্মল ক্যাপ— এই তিন ধরনের কোম্পানিতেই বিনিয়োগ করে। আপনার ঝুঁকির প্রবণতা বুঝে এই ধরনের ফান্ড বিনিয়োগ করার জন্য ভালো বিকল্প হতে পারে কারণ প্রতিটি স্কিম আলাদা আলাদা percentage-এ লার্জ, মিড ও স্মল ক্যাপে বিনিয়োগ করে। মোট অ্যাসেটের অন্তত 75% ইক্যুইটিতে বিনিয়োগ করতে হবে।
Flexi cap fund :
ফ্লেক্সি ক্যাপ ফান্ড একধরনের ইক্যুইটি ফান্ড যেখানে লার্জ, মিড ও স্মল ক্যাপে বিনিয়োগের ফ্লেক্সিবিলিটি আছে, অর্থাৎ পরিস্থিতি অনুযায়ী বিনিয়োগ পরিবর্তনের ক্ষমতা আছে ফান্ডটির। Flexi cap fund-এর ফান্ড ম্যানেজার বাজার পরিস্থিতি, কোম্পানির valuation, সুযোগ সুবিধা ইত্যাদি বুঝে ফান্ডের allocation পরিবর্তন করতে পারে। যেমন ধরুন, বাজার যদি ভোলাটাইল থাকে বা অনিশ্চিত থাকে সেইসময় ফান্ড ম্যানেজার লার্জ ক্যাপের এক্সপোজার বাড়িয়ে দিতে পারে কারণ লার্জ ক্যাপ তুলনায় কম ভোলাটাইল। আবার বাজার যখন বুলিশ হয়, সেইসময় ইনভেস্টমেন্ট সরিয়ে মিড ও স্মল ক্যাপে নিয়ে যেতেও পারে, যেখানে বৃদ্ধির সম্ভাবনা বেশি। Flexi cap fund নিজেদের মোট অ্যাসেটের অন্তত 65% ইক্যুইটিতে অবশ্যই বিনিয়োগ করবে।
Multi ও Flexi cap fund-এর পার্থক্য
| মাপকাঠি | Multi cap fund | Flexi cap fund |
| অর্থ | লার্জ, মিড ও স্মল ক্যাপ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে এই ইক্যুইটি ফান্ডটি। | মার্কেট পরিস্থিতি বুঝে লার্জ, মিড ও স্মল ক্যাপ কোম্পানিতে allocation পরিবর্তন করতে পারে। |
| ইক্যুইটিতে বিনিয়োগ | মাল্টি ক্যাপ ফান্ড অবশ্যই 75% অ্যাসেট ইক্যুইটিতে বিনিয়োগ করবে। অর্থাৎ স্কিমের মোট অ্যাসেটের 75% অবশ্যই ইক্যুইটি অথবা ইক্যুইটি-সম্বন্ধীয় স্টকে বিনিয়োগ করবে। | ফ্লেক্সি ক্যাপে ইক্যুইটি এক্সপোজার অন্তত 65% অর্থাৎ মোট অ্যাসেটের কমপক্ষে 65% ইক্যুইটি বা সেই সম্বন্ধীয় অ্যাসেটে বিনিয়োগ করবে। |
| মার্কেট ক্যাপ allocation | SEBI-র নিয়ম অনুযায়ী মাল্টি ক্যাপ ফান্ড মোট অ্যাসেটের 25% অবশ্যই লার্জ, মিড ও স্মল ক্যাপে বিনিয়োগ করবে। | ফ্লেক্সি ক্যাপ ফান্ডে এইরকম কোনো বাধ্যতা নেই। ফলে এই ফান্ড যে-কোনো মার্কেট ক্যাপে ইচ্ছেমতো বিনিয়োগ করতে পারে। |
| ফান্ড ম্যানেজারের দক্ষতা | স্টক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দক্ষতা প্রয়োজন, তবে পূর্ব নির্ধারিত শতাংশের ভিত্তিতে মার্কেট ক্যাপ অনুযায়ী স্টক বাছতে হবে। | মার্কেট পরিস্থিতি বুঝে অ্যালোকেশন পরিবর্তন করার ক্ষমতা থাকা দরকার। |
| ঝুঁকি | মাল্টি ক্যাপ ফান্ড লার্জ, মিড ও স্মল ক্যাপ স্টকে বিনিয়োগ করে। ফলে এই ফান্ড শুধুমাত্র লার্জ ক্যাপে বিনিয়োগের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। | ফ্লেক্সি ক্যাপ ফান্ডে ইক্যুইটি এক্সপোজার তুলনায় অনেক বেশি। ফলে এখানে স্টকের মিশ্রণ অনেক ভালো যা মাঝারি রিটার্ন প্রদান করে। তাছাড়াও যদি এই ফান্ড দীর্ঘসময় পর্যন্ত ধরে রাখা যায় তাহলে বাজার অস্থিরতা কমে যাওয়ার ফলে ঝুঁকি কমে। |
কারা মাল্টি ক্যাপ ফান্ডে বিনিয়োগ করবেন?
যেসব বিনিয়োগকারীরা বাজারের একাধিক ক্ষেত্রে ডিভারসিফাইড এক্সপোজার চান এবং মাঝারি থেকে ভালো রিটার্ন আশা করেন তাঁদের জন্য মাল্টি ক্যাপ উপযুক্ত। মাল্টি ক্যাপ ফান্ড শেয়ার বাজারের সমস্ত দিক জুড়ে বিনিয়োগ করে। ফলে এখানে যেমন মিড ও স্মল ক্যাপের মতো ভোলাটাইল বিনিয়োগ থাকতে পারে তেমনই লার্জ ক্যাপের মতো তুলনায় স্থিতিশীল বিনিয়োগও থাকে। অর্থাৎ যেসকল বিনিয়োগকারীরা মাঝারি থেকে উচ্চ ঝুঁকি নিতে পারেন এবং মিড ও স্মল ক্যাপের অস্থিরতায় স্বচ্ছন্দ, তাঁরা নিজেদের বিনিয়োগে মাল্টি ক্যাপ ফান্ড যোগ করতে পারেন। এছাড়াও লং টার্ম বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত এটি।
কারা ফ্লেক্সি ক্যাপ ফান্ডে বিনিয়োগ করবেন?
যাঁরা লার্জ ক্যাপভিত্তিক ফান্ডে বিনিয়োগ করতে চান আবার মিড ও স্মল ক্যাপের বিনিয়োগের কৌশলগত সুবিধাও নিতে চান তাঁদের জন্য উপযুক্ত এই ফান্ডটি। তবে এখানেও আপনাকে অন্তত ৫ বছরের মেয়াদে বা তার বেশি বিনিয়োগ করতে হবে, স্বল্পমেয়াদের ঝুঁকি কমাতে।
মাল্টি ক্যাপ ফান্ডের সুবিধা-অসুবিধা
সুবিধা :
- আলাদা আলাদা মার্কেট ক্যাপে বিনিয়োগের সুযোগ থাকায় সামগ্রিক ঝুঁকি ও অস্থিরতা কমে।
- এখানে মার্কেট ক্যাপ অ্যালোকেশনের পূর্ব নির্ধারিত একটি নিয়ম বা বাধ্যতা আছে। ফলে এটির রিটার্ন বেঞ্চমার্ক থেকে খুব বেশি সরে যায় না, অর্থাৎ deviation কম হয় ও ধারাবাহিক রিটার্ন দেয়।
অসুবিধা :
- পূর্ব নির্ধারিত অ্যালোকেশন নিয়ম একদিকে সুবিধার হলেও বাজার পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ঝুঁকি কমানোর ক্ষমতা মাল্টি ক্যাপ ফান্ডের ফান্ড ম্যানেজারের নেই।
- পূর্ব নির্ধারিত অ্যালোকেশনের কারণে প্রতিটি সেগমেন্টে যেহেতু ন্যূনতম এক্সপোজার করতেই হবে, তাই অধিক রিটার্নের সুযোগ কিছু ক্ষেত্রে হাতছাড়া হতে পারে।
ফ্লেক্সি ক্যাপ ফান্ডের সুবিধা-অসুবিধা
সুবিধা :
- বাজারের পরিস্থিতি ও সুযোগ সুবিধা বুঝে পোর্টফোলিওতে অদলবদলের সুযোগ থাকে ফ্লেক্সি ক্যাপ ফান্ডের ফান্ড ম্যানেজারের।
- ফান্ড ম্যানেজারের বিনিয়োগ কৌশল ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে flexi cap fund প্রতিটি ক্যাটাগরির সর্বোৎকৃষ্ট বিকল্পের সুযোগ নিতে পারে— যেমন লার্জ ক্যাপ স্টকের সুরক্ষা ও দামের স্থিরতা পেতে পারে, একইভাবে মিড ও স্মল ক্যাপ স্টকের বৃদ্ধির সম্ভাবনাকেও কাজে লাগাতে পারে।
অসুবিধা :
- ফ্লেক্সি ক্যাপ ফান্ডে যেহেতু ফান্ড ম্যানেজার নিজের বিচক্ষণতায় পোর্টফোলিওর অ্যালোকেশন যে-কোনো সময়ে পরিবর্তন করতে পারে, তাই সেই সিদ্ধান্ত সবসময় বিনিয়োগকারীর পক্ষে না-ও হতে পারে। ফলে এক্ষেত্রে ফান্ড ম্যানেজারের পক্ষপাতিত্বের সম্ভাবনা থেকে যায়।
- ফ্লেক্সি ক্যাপ ফান্ডে রিটার্ন বাড়াতে ফান্ড ম্যানেজার ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েই পারে। ফলে ফান্ডটি অতিরিক্ত ভোলাটাইল হতে পারে ও ঝুঁকি বহন করতে পারে।
- এছাড়াও যেহেতু ফান্ড ম্যানেজার খুব ঘনঘন পোর্টফোলিও rebalancing করে তাই এর expense ratio বেশি হয় সাধারণত।
মাল্টি ক্যাপ ও ফ্লেক্সি ক্যাপ দুটিই ইক্যুইটি ইনভেস্টরদের জন্য কার্যকর বিনিয়োগ বিকল্প। কিন্তু দুটি বিনিয়োগেরই বৈশিষ্ট্য ও কার্যকারিতা আলাদা। দুটির পার্থক্য বুঝে আপনার বিনিয়োগ চাহিদা, প্রত্যাশা অনুযায়ী বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিন। এছাড়াও নিয়মিত নিজের বিনিয়োগুলি নজরে রাখুন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন আনুন।





