ডিভিডেন্ড কী?
তালিকাভুক্ত কোম্পানির নেট মুনাফা থেকে কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের জন্য পুরষ্কারস্বরূপ ডিভিডেন্ড প্রদান করা হয়। ডিভিডেন্ড মূলত নগদ, নগদ সমতুল্য, শেয়ার ইত্যাদির মাধ্যমে প্রদান করা হয়। কোম্পানির প্রয়োজনীয় খরচগুলি মিটিয়ে অবশিষ্ট মুনাফা থেকে ডিভিডেন্ড দেওয়া হয়ে থাকে। সাধারণত কোম্পানির বোর্ডের ডিরেক্টররা স্থির করেন এই ডিভিডেন্ডের পরিমাণ। মূলত প্রতি ত্রৈমাসিকে ডিভিডেন্ড প্রদান করা হয়। তবে কোম্পানি চাইলে একত্রিত মুনাফা পুনর্বিনিয়োগের জন্য ধরে রাখতে পারে, অথবা ভবিষ্যতের জন্য গচ্ছিত রাখতে পারে।
এগুলি সম্পদ ক্রয়, ঋণ পরিশোধ ও মূলধনের প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহৃত হয়। তবে কিছু কোম্পানি মুনাফা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে ভাগ করে দেয়। আর একেই ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ বলে। অর্থাৎ যদি কোনো ব্যক্তি কোম্পানির শেয়ার ক্রয় করেন, একমাত্র তবেই তিনি ডিভিডেন্ড পাওয়ার অধিকারী হবেন।
সাধারণত কোনো কোম্পানি, যারা তাদের শেয়ারহোল্ডারদের ডিভিডেন্ড দিতে ইচ্ছুক, তারা শেয়ারের ফেসভ্যালুর কিছু শতাংশ হিসেবে ডিভিডেন্ড প্রদান করেন। যেমন, ধরা যাক, কোনো কোম্পানির শেয়ারের ফেসভ্যালু ১০ টাকা এবং কোম্পানি ঘোষণা করেছে তারা ২০% ডিভিডেন্ড প্রদান করবে। অর্থাৎ প্রতি শেয়ারের জন্য একজন শেয়ারহোল্ডার (১০ x ২০%) = ২ টাকা লভ্যাংশ অর্থাৎ ডিভিডেন্ড পাবেন।
ডিভিডেন্ডের বিভিন্নরকম প্রকার
- নগদ লভ্যাংশ বা Cash Dividend : যখন কোনো কোম্পানি নিজেদের লাভের অংশ শেয়ারহোল্ডারদের নগদে প্রদান করে, তখন তাকে নগদ লভ্যাংশ বলে। এই প্রকার ডিভিডেন্ড চেকের মাধ্যমে বা ইলেক্ট্রনিক্যালি এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে পাঠানো হয়।
- স্টক ডিভিডেন্ড : যখন কোম্পানি নগদের বদলে শেয়ারহোল্ডারদের কোম্পানির শেয়ার প্রদান করে, তখন সেইরকম ডিভিডেন্ডকে স্টক ডিভিডেন্ড বলে। স্টক ডিভিডেন্ডের ক্ষেত্রে একজন শেয়ারহোল্ডারের কাছে কোম্পানির যতটুকু অংশের মালিকানা রয়েছে, সেই ভিত্তিতে তাঁকে আরও স্টক, ডিভিডেন্ড হিসেবে প্রদান করা হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় – যদি কোনো কোম্পানি 1:2 অনুপাতে স্টক ডিভিডেন্ড প্রদানের কথা ঘোষণা করে, এর অর্থ হল কোনো শেয়ারহোল্ডারের প্রতি দুটি শেয়ারের জন্য তিনি ডিভিডেন্ড হিসেবে ১টি শেয়ার পাবেন।
- কমন স্টক ডিভিডেন্ড : কোম্পানির একত্রিত মুনাফার অংশ থেকে এইপ্রকার ডিভিডেন্ড সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের প্রদান করা হয়। বিভিন্ন উপায়ে এই ডিভিডেন্ডের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়।
এছাড়াও ঘোষণার সময়ের উপর ভিত্তি করে ডিভিডেন্ডকে আরও কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয় –
- বিশেষ লভ্যাংশ বা Special Dividend : সাধারণ স্টকের উপর এই লভ্যাংশ প্রদান করা হয়। এই লভ্যাংশ মূলত নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে ইস্যু করা হয়ে থাকে। যখন কোনো কোম্পানি বেশ কয়েক বছর ধরে যথেষ্ট মুনাফা জমা করে এবং এই মুনাফা নিকট ভবিষ্যতে বা সেই মুহূর্তে ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না, তখন এই বিশেষ প্রকার লভ্যাংশ প্রদান করা হয়।
- অগ্রাধিকার লভ্যাংশ বা Preferred Dividend : এই ধরনের লভ্যাংশ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত স্টকহোল্ডারদের জন্য ইস্যু করা হয় এবং এর পরিমাণ নির্দিষ্ট থাকে। এটি সাধারণত প্রতি তিনমাস অন্তর প্রদান করা হয়।
- অন্তর্বর্তী লভ্যাংশ বা Interim Dividend : অর্থবছরের মাঝে বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি তৈরির পূর্বেই যে লভ্যাংশ প্রদান করা হয়, তাকে অন্তর্বর্তী লভ্যাংশ বলে। এক অর্থবছর বলতে এক বছরের এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে পরের বছর মার্চ পর্যন্ত সময়কালকে বোঝায়।
- অন্তিম লভ্যাংশ বা Final Dividend : বছর শেষে বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি প্রকাশের পর যে লভ্যাংশ প্রদান করা হয়, তাকে অন্তিম লভ্যাংশ বলে।
কোন কোম্পানিগুলি ডিভিডেন্ড প্রদান করে?
অপেক্ষাকৃত বড়ো, প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি, যাদের মুনাফা অর্জনের পরিমাণ বেশি, তারাই সাধারণত সবচেয়ে বেশি লভ্যাংশ প্রদান করে থাকে। ব্যাংকিং বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি, ফার্মা, তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলি নিয়মিতভাবে লভ্যাংশ প্রদান করে।
টেকনোলজি কোম্পানিগুলি নিয়মিত লভ্যাংশ প্রদান করতে পারে না, কারণ কোম্পানির উন্নয়ন ও গবেষণা-সংক্রান্ত বিষয়ে, ব্যবসা বৃদ্ধির জন্য ও কার্য পরিচালনার জন্য তারা মুনাফা গচ্ছিত রাখে।
কোম্পানি কেন ডিভিডেন্ড প্রদান করে?
কোনো কোম্পানিতে যখন কোনো বিনিয়োগকারী অর্থ বিনিয়োগ করেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি পুরস্কারস্বরূপ লভ্যাংশ আশা করেন। লভ্যাংশ প্রদানের ফলে কোম্পানির ইতিবাচক দিক ফুটে ওঠে এবং বিনিয়োগকারীর ভরসা বজায় রাখতে সাহায্য করে এই উদ্যোগ। কোম্পানি যখন উচ্চমানের লভ্যাংশ প্রদান করে, তখন বোঝা যায় কোম্পানির আয় ভালো হচ্ছে এবং কোম্পানির কার্যগুলি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে।
তবে কিছু নেতিবাচক ইঙ্গিতও মেলে। কোম্পানি যখন মুনাফার অর্থ পুনর্বিনিয়োগে ব্যবহার না করে সেই অর্থ দিয়ে লভ্যাংশ প্রদান করে, তখন এই ইঙ্গিতও মেলে যে, সম্ভবত কোম্পানির কাছে নতুন কোনো উপযুক্ত প্রোজেক্ট নেই, যেখানে বিনিয়োগের ফলে ভবিষ্যতে ভালো রিটার্ন পাওয়া সম্ভব। আবার কোনো কোম্পানির দীর্ঘদিনের লভ্যাংশ প্রদানের ইতিহাস থাকলেও, দেখা যায় কোম্পানির খারাপ ফলের দরুন লভ্যাংশের পরিমাণ কমে গেল।
তবে, লভ্যাংশ কমিয়ে দেওয়া বা লভ্যাংশ না দেওয়াকে সবক্ষেত্রে নেতিবাচক আখ্যা দেওয়া উচিত নয়। বিভিন্ন কোম্পানির বিভিন্নরকম উদ্দেশ্য থাকে। সেই উদ্দেশ্যমাফিক কোম্পানিগুলি মুনাফাকে কাজে লাগায়।
এবার ধাপে ধাপে দেখে নেওয়া যাক ডিভিডেন্ড কীভাবে কার্যকর হয়।
- লিস্টেড কোম্পানিগুলি অধিক মাত্রায় আয় অর্জন করে এবং সেই আয়ের থেকে যথেষ্ট পরিমাণ সঞ্চিত রাখে।
- কোম্পানির পরিচালকগণ স্থির করেন, সেই অর্থ পুনর্বিনিয়োগের জন্য কাজে লাগাবেন নাকি সেই পরিমাণ অর্থ শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে ভাগ করে দেবেন।
- প্রধান শেয়ারহোল্ডারদের অনুমতিক্রমে বোর্ডের সদস্যরা কোম্পানির শেয়ারের ওপর লভ্যাংশ ঘোষণা করে।
- লভ্যাংশ ঘোষণার সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ তারিখগুলি জানানো হয়।
- কোন শেয়ারহোল্ডাররা লভ্যাংশ পাওয়ার যোগ্য, সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
- সবশেষে লভ্যাংশ প্রদান করা হয় শেয়ারহোল্ডারদের।
কেন বিনিয়োগকারীরা ডিভিডেন্ড স্টকে বিনিয়োগ করতে চান?
যদিও লভ্যাংশ প্রদানের কোনো নিশ্চয়তা নেই, তবুও অনেক বিনিয়োগকারীরা আয়ের উৎস হিসেবে এটিকে দেখেন। আয়ের চাহিদা মেটাতে লভ্যাংশ প্রদানকারী স্টকগুলি একটি দুর্দান্ত উপায়। পাশাপাশি এই স্টকগুলিতে বিনিয়োগের ফলে সম্ভাব্য মূলধন বৃদ্ধির সুযোগ থাকে। মুদ্রাস্ফীতির সময়ে মূলধন বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে কারণ ক্রমবর্ধমান দামের বিপরীতে সম্পদের মূল্য বাড়লে তা আর্থিক সুরক্ষা প্রদান করে। লভ্যাংশ প্রদানকারী স্টকে বিনিয়োগের ফলে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রতি মাসে এটি স্থায়ী আয়ের উৎস হতে পারে। অন্যদিকে, অল্পবয়সি বিনিয়োগকারীরা সেই অর্থ তাঁদের পোর্টফোলিও-তে পুনর্বিনিয়োগের কাজে লাগান।
কখনও বন্ডের সুদের হার কম থাকলে, অন্যদিকে ডিভিডেন্ড ইল্ড বেশি হলে, ডিভিডেন্ড স্টকগুলি বন্ডের থেকে বেশি সুবিধা প্রদান করে।





