ফিন্যান্সের পরিভাষায় একটি বাক্য বেশ জনপ্রিয়— ‘Don’t place your eggs all in one basket’, অর্থাৎ একই ঝুড়িতে সব ডিম একসঙ্গে রাখবেন না। এই প্রাচীন প্রবাদটি অ্যাসেট অ্যালোকেশনের যথার্থ বর্ণনা দেয়। কারণ বিনিয়োগ করার মূল লক্ষ্য শুধুমাত্র মুনাফা অর্জন নয়, ঝুঁকি ও মুনাফার মধ্যে যথাযথ ভারসাম্য বজায় রেখে বিনিয়োগ লাভজনক করা। ভারতের শেয়ার বাজার অত্যধিক অনিশ্চিত। ফলে এখানে যে-কোনো বিনিয়োগকারীর প্রথম কাজ হবে অ্যাসেট অ্যালোকেশন। ২০২৫ সালে ভারতীয় অর্থনীতি 6.5% গ্রো করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেইসঙ্গে মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হারের পরিবর্তন এবং বৈদেশিক আশঙ্কাগুলিও একসঙ্গে মাথাচাড়া দিচ্ছে। ফলে এই মুহূর্তে প্রয়োজন সঠিক অ্যালোকেশনের।
একজন দক্ষ বিনিয়োগকারী জানেন যে, অন্য কোনোদিকে বিবেচনা না করে শুধুমাত্র উচ্চ রিটার্নের দিকে মনোযোগ দিলে আর্থিক ক্ষতি হতে পারে, আবার অতিরিক্ত সতর্কভাবে বিনিয়োগ গ্রোথের পথে বাধা তৈরি করে। এইজন্য প্রয়োজন সঠিক অ্যাসেট অ্যালোকেশনের। অ্যাসেট অ্যালোকেশনের ফলে পোর্টফোলিওতে ভারসাম্য তৈরি হয় এবং আর্থিক লক্ষ্য এবং ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সামঞ্জস্য আসে। নতুন বিনিয়োগকারীরা জানেন শুধুমাত্র ভালো রিটার্ন বা risk-reward ratio-তে ভরসা না করে পোর্টফোলিওতে সঠিক অ্যাসেট থাকাও প্রয়োজন, অর্থাৎ সহজ কথায় অ্যাসেট ক্লাসের মধ্যে ডাইভারসিফাই করা দরকার। একটি পোর্টফোলিওতে যদি যথার্থ অ্যাসেটের ডিভারসিফিকেশন থাকে তাহলে সেটি ইক্যুইটি, ডেট ইন্সট্রুমেন্ট, রিয়াল এস্টেট, গোল্ড ইত্যাদি একাধিক অ্যাসেটে বিনিয়োগের মাধ্যমে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করে।
শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের সময়ে দুটি বিষয় বিনিয়োগকারীদের খেয়াল রাখা প্রয়োজন:
→ অ্যাসেটের মধ্যে প্রতিটি অ্যাসেট নিজের কিছু কিছু ঝুঁকি বহন করে। যেমন ডেট ইন্সট্রুমেন্ট বা ঋণ সম্পদকে সাধারণত কম ঝুঁকি-সম্পন্ন মনে করা হয়। আবার যে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ গ্রোথ চান তাঁরা স্টক, রিয়াল এস্টেটের মতো মালিকানা-সম্বন্ধীয় অ্যাসেট বা সম্পদে বিনিয়োগ করতে চান। সুতরাং অ্যাসেটের ঝুঁকির মধ্যে সামঞ্জস্য বা ব্যালেন্স রাখতে হলে অ্যাসেটের যথার্থ অ্যালোকেশন প্রয়োজন।
→ বিনিয়োগকারীদের উচিত দীর্ঘমেয়াদের লক্ষ্যে বিনিয়োগ করা। স্বল্পমেয়াদে শেয়ার বাজার অনেক বেশি ভোলাটাইল থাকে, ফলে দীর্ঘমেয়াদের লক্ষ্য নিয়ে বিনিয়োগ করা উচিত।
২০২৫ সালে কীভাবে করবেন অ্যাসেট অ্যালোকেশন?
→ Equity : কোম্পানিগুলির দুর্দান্ত আর্থিক ফলাফল এবং বিনিয়োগে ডিজিটাল প্রযুক্তির আমদানির ফলে ভারতীয় শেয়ার বাজার বর্তমানে বিনিয়োগের অন্যতম ঠিকানায় পরিণত হয়েছে। গত ১০ বছরে Nifty 50-র CAGR 12.5%। তবে US Fed rate বেড়ে যাওয়া, তেলের দামের অস্থিরতা ইত্যাদি বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে ঝুঁকি থেকেই যায়। সেই কারণে কোনো বিনিয়োগকারী যদি ইক্যুইটিতে বিনিয়োগ করতে চান তাহলে মোট ইক্যুইটি ইনভেস্টমেন্টের অর্ধেক অর্থাৎ 50% লার্জ ক্যাপে বিনিয়োগ করতে হবে যা তুলনায় কম ভোলাটাইল এবং কম ঝুঁকিসম্পন্ন। বাকি 30% মিড ক্যাপ ফান্ডে এবং 20% সবচেয়ে ভোলাটাইল অ্যাসেট অর্থাৎ স্মল ক্যাপে বিনিয়োগ করা যেতে পারে। এছাড়াও যদি আপনি pure equity investment করতে না চান, তাহলে হাইব্রিড ফান্ডে বিনিয়োগ করতে পারেন।
→ Fixed income : Aggressive investment-এর পর এরপর conservative investor-দের বন্ড এবং এফডি বিনিয়োগের ভালো বিকল্প। সুদের হারের পরিবর্তনের ফলে ২০২৫ সালে সরকারি সিকিউরিটি, কর্পোরেট বন্ড এবং স্থির আয়ের মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিনিয়োগে স্টেবিলিটি আনতে পারে। ১০ বছরের গভর্নমেন্ট বন্ডের বর্তমান ইল্ড 6.72% এবং কর্পোরেট বন্ডগুলি মোটামুটি 6.5%-9% ইল্ড দিচ্ছে।
→ Gold : সোনা সুরক্ষিত অ্যাসেট হিসেবে পরিচিত। ২০২৩ সালে সোনা থেকে রিটার্ন 15%-এরও বেশি ছিল এবং রূপার রিটার্ন এর বছর আগের তুলনায় 20% বেড়েছে।
→ Real Estate : রিয়াল এস্টেট সেক্টরটি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। রেসিডেন্সিয়াল রিয়াল এস্টেটের তুলনায় কমার্শিয়াল এবং ওয়্যারহাউসের বৃদ্ধির সম্ভাবনা বেশি। তবে সরাসরি রিয়াল এস্টেটে বিনিয়োগে ন্যূনতম বিনিয়োগের পরিমাণ অনেক বেশি। সেই কারণে ভারতের প্রধান REITগুলি অর্থাৎ Real Estate Investment Trust যেমন, Nexus Select Trust REIT, Mindspace REIT, Brookfield India REIT, Embassy REITগুলি শুরু থেকে এখনও পর্যন্ত 6% থেকে 39% পর্যন্ত রিটার্ন দিয়েছে।
সঠিক অ্যাসেট অ্যালোকেশন নির্ধারণ :
সকলের জন্য একই অ্যাসেট অ্যালোকেশন সম্ভব নয়। আলাদা আলাদা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে অ্যাসেট অ্যালোকেশনের বিষয়টি। যেমন—
1. বিনিয়োগের মেয়াদ : আপনি যদি বেশি সময়ের জন্য বিনিয়োগ করতে চান অর্থাৎ আপনার লক্ষ্য যদি থাকে দীর্ঘমেয়াদের তাহলে কিছুটা বেশি ঝুঁকির বিনিয়োগ করা যেতে পারে কারণ দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি কমে আসে। অন্যদিকে অল্পবয়সি বিনিয়োগকারীরা ইক্যুইটি অ্যালোকেট বেশি করতে পারেন। বয়স্করা debt বা fixed income security-তে বেশি বিনিয়োগ করবেন।
2. আর্থিক পরিস্থিতি : যেসব বিনিয়োগকারীদের নিশ্চিত আয় রয়েছে এবং এমারজেন্সি ফান্ড তৈরি রয়েছে, তাঁরা কিছুটা বেশি ঝুঁকি নিতে পারেন অনিশ্চিত আয় করেন এমন ব্যক্তির তুলনায়।
3. আয় : যাঁদের আয় বেশি তাঁরা সাধারণত কিছুটা বেশি ঝুঁকি নিতে পারেন এবং বেশি রিটার্নের সুযোগও থাকে তাঁদের।
২০২৫ সালের অ্যাসেট অ্যালোকেশন প্রবণতা :
উপরোক্ত অ্যাসেট ছাড়াও বেশ কিছু বিকল্প বিনিয়োগ বা নতুন সেক্টরগুলিতে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। যেমন—
- প্রযুক্তি ও AI চালিত বিনিয়োগ : AI দ্বারা পরিচালিত কৌশল, রোবো অ্যাডভাইজার ইত্যাদি প্রযুক্তিগুলি বিনিয়োগকারীদের অ্যালোকেশনে সহায়তা করে।
- প্যাসিভ ইনভেস্টিং : চিরাচরিত অ্যাসেট বাদেও ইনডেক্স ফান্ড ও ETF-এর মতো প্যাসিভ ফান্ডগুলিতেও বিনিয়োগ বাড়ছে।
বিকল্প বিনিয়োগ : এছাড়াও REIT, commodity, বিদেশি ইক্যুইটি ইত্যাদি অ্যাসেট ক্লাসে বিনিয়োগ করে ইনভেস্টররা নিজেদের পোর্টফোলিও ডাইভারসিফাই করছেন।





