কোনো কিছু কেনার সময়ে অনেকক্ষেত্রে আমরা দরদাম করে থাকি। এমনকি টাকা বাঁচাতে ডিসকাউন্ট বা সেলেও জিনিস কিনি। ডিসকাউন্ট বা ছাড়ে জিনিস কেনার অর্থ হল কম দামে জিনিসটি পাওয়া। কিন্তু তার মানে এই নয় যে জিনিসটি অন্তর্নিহিত মূল্য কমে গেল। আমরা কেবল জিনিটি কম দামে পাচ্ছি, জিনিসটির ভ্যালু কিন্তু একই থাকছে। ঠিক এই একই কথা শেয়ার বাজারের জন্যও সত্যি। কিন্তু অসুবিধাটা হল দোকানে কেনাকাটার ক্ষেত্রে আমরা যেমন আগে থেকে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সেই ডিসকাউন্টের ব্যাপারে জানতে পারি শেয়ার বাজারে সেই সুবিধা নেই। এখানে আপনাকে বুঝতে হবে কোন স্টকটি undervalued আছে বা নিজের আসল ভ্যালু থেকে কম মূল্যে ট্রেড করছে। তার আগে দেখে নিই ঠিক কী কী কারণে স্টক undervalued হয়।
এক, Down market: বাজার যখন নিম্নমুখী থাকে অর্থাৎ বিয়ারিশ হয়, সেই সময়ে কোম্পানির শেয়ারের দাম কমে যেতে পারে। হয়তো সামগ্রিকভাবে কোম্পানি ফলাফল ভালো কিন্তু পুরো শেয়ার বাজার বিয়ারিশ হলে শেয়ারের দামও তখন undervalued হয়ে যায়।
দুই, ব্যবসার পরিবর্তন: কোম্পানি যদি নতুন কোনো ডিরেকশনে যেতে চায় বা উন্নত কোনো পণ্য বা পরিষেবা চালু করে তখন অনেক সময়ে বিনিয়োগকারীদের সেন্টিমেন্ট তৈরি হতে সময় লাগায় শেয়ারের দাম কমে যায় বা undervalued হয়।
তিন, Cyclical Stock: অনেক কোম্পানি এমন আছে যেগুলি সিক্লিক্যাল ধরনের অর্থাৎ সেই কোম্পানির পণ্য বা পরিষেবার চাহিদা সারাবছর থাকে না। ফলে যে সময়ে চাহিদা থাকছে না তখন মুনাফা কম হওয়ায় সাময়িকভাবে শেয়ারের দাম কমে যায়। এদেরকে cyclical stock বলে। বছরের কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে বা ইকোনমি যখন সামগ্রিকভাবে গ্রো করে তখন এই কোম্পানির স্টকের দাম বাড়ে।
চার, বিনিয়োগকারীদের মনোভাব: বাজারের গতিবিধির ওপর ইনভেস্টারদের সেন্টিমেন্ট জড়িত। বাজারের ফলাফল ভালো হলে, সমগ্র ইকোনমি চাঙ্গা থাকলে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কেনেন। তখন শেয়ারের চাহিদা বেশি থাকায় দামও বাড়ে। অন্যদিকে কোনো খারাপ খবরে যদি মার্কেট ক্রমাগত নিম্নমুখী হতে থাকে তখন বিনিয়োগকারীরাও বাজরের উপর ভরসা রাখতে পারেন না ফলে ক্ষতি হওয়ার ভয়ে panic sell শুরু হয় এবং শেয়ারের অন্তর্নিহিত মূল্য বেশি থাকলেও দাম কমতে থাকে ও শেয়ারটি undervalued হয়ে যায়।
পাঁচ, ৯-এর দশকের শেষের দিকে টেক স্টকগুলির চাহিদা প্রচুর বেড়েছিল এবং এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে কোম্পানিগুলির valuation কৃত্রিমভাবে বেড়ে গিয়েছিল এবং bubble তৈরি হয়ে গিয়েছিল। পরে ২০০০ সাল আসতে আসতে ভ্যালুয়েশন পড়তে থাকে এবং টেক কোম্পানির শেয়ারের দাম undervalued হয়ে যায়। ফলে দেখা গেছে যখনই কোনো নির্দিষ্ট সেক্টর ট্রেন্ডিং-এ থাকে তখন শেয়ারের দাম বাড়ে এবং ট্রেন্ড চলে গেলে শেয়ারগুলি undervalued হয়ে যায়।
ছয়, এছাড়া কোম্পানি সম্পর্কে সাময়িক কোনো নেতিবাচক খবরে শেয়ারের দাম কমে যায়, যদিও খেয়াল করলে দেখা যাবে কোম্পানির আর্থিক প্যারামিটারগুলি হয়তো ভালো রয়েছে। তবুও এইধরনের খবর শেয়ারের দামে প্রভাব ফেলে।
এবার দেখে নেব একটি স্টক সত্যিই undervalued কিনা বা নিজের আসল ভ্যালু থেকে কম দামে ট্রেড করছে কিনা জানতে কী কী বিষয় দেখবেন।
- প্রথমেই দেখতে হবে কোম্পানিটি বেশ কয়েকটি financial ratio। যেমন প্রথমেই P/E ratio। সাধারণত P/E কম মানে স্টকটি কম ভ্যালুতে ট্রেড করছে বোঝায়। এরপর P/B ratio। এটিও 1-এর থেকে কম হলে স্টকটি undervalued আছে বোঝায়। D/E ratio অর্থাৎ Debt to Equity R, যেটা দেখায় কোম্পানির ইক্যুইটির বিপরীতে debt বা ঋণ কতটা আছে। এটিও কম হওয়া প্রয়োজন। PEG ratio বা Price/Earning to growth ratio। কম PEG ratio এবং উন্নত earning বোঝায় স্টকটি undervalued। এছাড়াও ROE অর্থাৎ Return on Equity বেশি হলে কোম্পানির আর্থিক দিক উন্নত আছে বুঝতে হবে।
এই সমস্ত রেশিও দেখার সময়ে খেয়াল রাখতে হবে প্রতিটি ক্ষেত্রে আপনাকে একই সেক্টরের মধ্যে তুলনা করতে হবে এবং এই রেশিও-গুলোর ক্ষেত্রে ‘ideal’ বা ‘ভালো’ রেশিও বলে কিছু হয় না। একেকটি sector-এর জন্য রেশিওর মান একেকরকম হয়।
- এরপর দেখা দরকার market capitalization। কোম্পানির মোট outstanding shareগুলির মোট মার্কেট ভ্যালুকেই market cap বলে। সাধারণত small cap কোম্পানিগুলি বাজরে নতুন হওয়ায় এবং কম market cap যুক্ত হওয়ায় বেশি ভোলাটাইল। অন্যদিকে large cap কোম্পানিগুলি তুলনায় স্টেবল। তাই দুটি কোম্পানির মধ্যে তুলনা করতে হলে একই market cap যুক্ত কোম্পানির মধ্যে তুলনা করতে হবে।
- কোম্পানির dividend yield ও cash flow আরও দুটি ফ্যাক্টর যা কোম্পানির আর্থিক পরিস্থিতি বোঝায়। Dividend yield বেশি হলে বুঝতে হবে কোম্পানি নিজের প্রফিটের বেশিরভাগ শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে ভাগ করে দিচ্ছে। অর্থাৎ এতে কোম্পানির যাবতীয় ঋণ মেটাতে বা ভবিষ্যতে বৃদ্ধি বা growth-এর ক্ষেত্রে cash flow কম পড়তে পারে। তবে যদি দেখা যায় শেয়ারের ভ্যালু কম থাকলেও ধারাবাহিকভাবে কোম্পানি dividend দিতে পারছে তাহলে সেটি কোম্পানির পক্ষে একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।
- কোনো স্টক undervalued আছে কিনা সেটা জানতে কোম্পানিটি প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির স্টকের দাম দেখা যেতে পারে। এটি দেখতে আপনি শেয়ার দামের moving average দেখতে পারেন। একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেয়ারের গড় দাম দেখায় moving average। তবে এইভাবে তুলনা করার সময়ে শুধু দাম নয় অন্যান্য রেশিওগুলিও তুলনা করতে হবে। কারণ আপনি যে প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির সঙ্গে তুলনা করছেন সেটি হয়তো overvalued আছে। তখন মূল্যায়ন সম্ভব নয়, তাই দামের পাশাপাশি অন্যান্য ফ্যাক্টরগুলি দেখা জরুরি।
- কোম্পানির income statement, balance sheet ইত্যাদি দেখা জরুরি। দেখুন প্রতি ত্রৈমাসিকে কোম্পানির earning বেড়েছে কিনা।
- নতুন সেক্টের, যেগুলি ভবিষ্যতে ভালো বৃদ্ধি পেতে পারে, সেই সেক্টরের কোম্পানিগুলির স্টকের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। যেমন আগামী দিনে renewable energy সম্ভবত একটি শক্তিশালী ইন্ডাস্ট্রি হতে চলেছে বা ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল সেক্টরগুলি ভালো ফল করবে ভবিষ্যতে কারণ দেশ পরিকাঠামো দিক দিয়ে এগোচ্ছে। ফলে এই কোম্পানিগুলির স্টক বর্তমানে undervalued আছে কিনা তা অন্যান্য মেট্রিকগুলির সাহায্যে তুলনা করে দেখুন।





