Article By – সুনন্দা সেন

ডিজিটাল জগতের পরিচিত নাম হলো বিটকয়েন বা ক্রিপটোকারেন্সি। অবশ্য এই কয়েনে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিপুল সংখ্যক বিনিয়োগকারীরা দূরে থাকতে পছন্দ করেন। এমনকি বিশ্বের বেশকিছু দেশে বিটকয়েন নিষিদ্ধ। তবে বর্তমানে বিটকয়েনের উপর মন্তব্য ব্যক্ত করেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। যে কারণে নতুন বিনিয়কারীদের মধ্যে এই বিষয় জানার আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আপনাদের মধ্যেও যদি এমন কেউ থেকে থাকেন, যার বিটকয়েনের প্রতি আগ্রহ জন্মাচ্ছে! তাদের জন্য আজকের প্রতিবেদন।
বিটকয়েন কী?
বিটকয়েন (Bitcoin) বা ক্রিপ্টোকারেন্সি (Cryptocurrency) হল ডিজিটাল কারেন্সি বা ভার্চুয়াল মুদ্রা। যাতে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ব্লক চেন মারফত এবং ডাটা ট্রান্সফারের মধ্য দিয়ে লেনদেন হয়। সম্প্রতি ভারতে এই মুদ্রার লেনদেন নিষিদ্ধ করে আইনি জালে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কারণ, এই মুদ্রার কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই বলেই এটিকে বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার। তবে সুপ্রিম কোর্ট ২০২০ সালে ক্রিপ্টোকারেন্সির উপর ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে৷ তবে, প্রবিধানগুলি এখনও বিকশিত হচ্ছে, এবং সরকার একটি নিয়ন্ত্রক কাঠামো বিবেচনা করছে৷ একমাত্র সেন্ট্রাল আমেরিকার El Salvador নামে একটি দেশ ক্রিপ্টোকারেন্সিকে নিজেদের দেশে মান্যতা দিয়েছে। এই দেশটি বিশ্বের প্রথম দেশ যারা বিটকয়েন-কে লেনদেনের ক্ষেত্রে সহায়ক মুদ্রা হিসেবে মেনে নিয়ে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাইনিং শুরু করেছে। অন্যদিকে চিনও পিছিয়ে নেই। তালিকায় রয়েছে জাপান, যুক্তরাজ্য সহ অন্যান্য অনেক দেশে।
বিটকয়েন কিভাবে কাজ করে?
বিটকয়েন তার অন্তর্নিহিত প্রযুক্তি, ব্লকচেইনের সাহায্যে মধ্যস্থতাকারীদের ছাড়াই লেনদেনের কাজ করে। বর্তমানে যদি আপনাকে কারো কাছে তহবিল স্থানান্তর করতে হয়, সম্ভাব্য উপায়গুলির মধ্যে একটি হল নগদ প্রদান করা বা বিকল্পভাবে বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারীর ব্যবহার বা ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থের লেনদেন করা। তবে উভয় ক্ষেত্রেই না নগদ অর্থ বা বৈদ্যুতিন সাহায্যে স্থানান্তর বা একজন মধ্যস্থতাকারীকে জড়িত থাকে। যখন মধ্যস্থতাকারীরা জড়িত থাকে, তখন লেনদেনের খরচ থাকে। কিন্তু বিটকয়েনের ক্ষেত্রে পিয়ার টু পিয়ার (PEER to PEER) লেনদেন করা হয়। যেখানে অন্য কোন ব্যক্তির কোন হাত থাকে না। একজন কম্পিউটার থেকে অন্য একজনের কম্পিউটারে বিটকয়েন ট্রান্সফার করে। আর শুধুমাত্র সেই ব্যক্তি এই সেটি Access করতে পারবে। এছাড়া এই লেনদেনে কোনো খরচ নেই।
বিটকয়েনের আবিষ্কার কে বা আবিষ্কর্তা কে?
বিটকয়েন বা ক্রিপ্টোকারেন্সি আবিষ্কর্তা হল সাতোশি নাকামোতো (Satoshi Nakamoto)। ওই নামের পরিচিত ব্যাক্তি কম্পিউটার প্রোগ্রামার বা প্রোগ্রামারদের গ্রুপ। অবশ্য ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে বিটকয়েনের আবিষ্কার হলেও ২০০৯ সালের ৩ জানুয়ারি সফ্টওয়্যারটি জনসাধারণের জন্য উপলব্ধ করা হয়। সেই সময় একটি রিসার্চ পেপার পাবলিশ করা হয়েছিল। আর সেই রিসার্চ পেপার Satoshi Nakamoto নামে একজন ব্যক্তি দাবি করেন যে তিনি বিটকয়েনের আবিষ্কর্তা। কিন্তু এটাকে আসলে মনে করা হয় যে, এটি একটি ভুয়া নাম বা ভুল নাম। সাতোশি নাকামোতোর আসল পরিচয় কখনোই যাচাই করা হয়নি।
বিটকয়েনের আবিষ্কারের উদ্দেশ্য?
সাতোশি নাকামোতোর কথা অনুযায়ী বিটকয়েনের আবিষ্কারের উদ্দেশ্যটি ছিল লেনদেনে সম্পূর্ণ গোপনীয়তা রক্ষা করা। কার কাছে কত পরিমাণ সম্পদ বা অর্থ রয়েছে সেটা লুকোতে বিটকয়েনের মাধ্যমে রূপান্তরের মধ্যমে গোপনীয়না অর্জনের সাথ বিটকয়েন কোথা থেকে কোথায় ট্রানজেকশন সেটার গোপনীয়তা রক্ষা করা। পাশাপশি এই লেনদেনে সরকারের কোনো প্রকার হাত না থাকে সেই বিষয় নিশ্চিত করা। আর দ্বিতীয়ত ইউরোপীয় সার্বভৌম-ঋণ সংকট – বিশেষ করে 2012-2013 সাইপ্রিয়ট আর্থিক সংকট – FinCEN-এর বিবৃতি মুদ্রার আইনি অবস্থানের উন্নতি, ক্রমবর্ধমান মিডিয়া এবং ইন্টারনেটের আগ্রহ।
বিটকয়েনের সংখ্যা কত ?
বিটকয়েনের মোট সংখ্যা ২১ মিলিয়ন। এরমধ্যে ১৮.৯ মিলিয়ন বিটকয়েন বাজারে অবস্থান করছে। বাকি সব মালিকের কাছে আছে। বিটকয়েনের এতটাই প্রাইভেসি যে এর মালিক কে আছে তা বোঝা যায়নি। অর্থাৎ মোট বিটকয়েনের পরিমাণ ভবিষ্যতে ও একই থাকবে। মোট বিটকয়েনের পরিমাণ ২০০৯ সালে যা ছিল তা ২০২৪ সালেও আছে। তবে জানা যাচ্ছে যে ২১৪০ সাল পর্যন্ত মোট ২,১০,০০,০০০ বিটকয়েন তৈরী হবে এবং পরবর্তীতে আর কোন নতুন বিটকয়েন তৈরী করা হবে না।
বিটকয়েনের মূল্যের ইতিহাস কী?
প্রথম ২০০৯ সালে ৫.০২ ডলারে ৫,০৫০ বিটকয়েন বিক্রি করে। সেই অনুযায়ী প্রতিটি বিটকয়েনের মূল্য ছিল ০.০০০৯ ডলার। যার ভারতীয় মূল্য ৬.৫৭ থেকে ৬.৬০ টাকা। তবে ২০০৮ থেকে ২০২৪ সালে বিটকয়েনের যে কতটা পরিমাণ ভ্যালুয়েশন বৃদ্ধি পেয়েছে সেটা সকলেই জানেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে বিটকয়েন প্রায় ৪৩,৯০৬ ডলারে লেনদেন করেছে। তারপরে চলতি বছরের মার্চ মাসে বিটকয়েন ৭৩,৭৫০ ডলারের একটি নতুন রেকর্ড গড়ে। বিটকয়েনের বর্তমান মূল্যা ৫৯,৭২১ ডলার। বর্তমানে বিটকয়েনের বা ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজার নিম্নমুখী। বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন যে মার্কিন মন্দা দিগন্তে আসতে পারে এবং ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগগুলিও ক্রিপ্টোকারেন্সির উপর ওজন করছে। কারণ বিটকয়েন মার্চে তার সর্বকালের সর্বোচ্চ থেকে প্রায় ১৯.১৩% কমেছে।
বিটকয়েনকে কি ভাগ করা যায়?
টাকার অনেক ভাগ রয়েছে। যেমন ধরুন ১০০ পয়সায় ১ টাকা। তেমন ভাবে বিটকয়েনেরও ভাগ রয়েছে। বিটকয়েনের সব থেকে ছোটো ভাগটি রয়েছে তাকে সাতোশি (Satoshi) বলা হয়। ১০০ মিলিয়ন সাতোশি নিয়ে একটা বিটকয়েন।
কোন দেশ প্রথম বিটকয়েন কে Legal Tender হিসেবে বিবেচিত করেছিল?
মধ্য আমেরিকায় এল সালভাদর (El Salvador) নামে যে দেশটি রয়েছে তা পৃথিবীর ছোট একটা দেশ । আর এই দেশটি প্রথম বিটকয়েনকে আইনি দরপত্র বা Legal Tender হিসেবে বিবেচিত করেছিল। এছাড়াও অনেক বড় বড় কোম্পানি বিটকয়েন কে গ্রহণ করত। যার মধ্যে একটি হলো WordPress, এটার মধ্য দিয়ে নানা রকম Website তৈরি করা হয়।
বিটকয়েন কি ভারতে বৈধ?
হ্যাঁ, বিটকয়েন ভারতে বৈধ। বিটকয়েন বিশ্বব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে এবং ভারতও এর ব্যতিক্রম নয়। যাইহোক, ভারতে বিটকয়েনের আইনি অবস্থা অনেক বিতর্ক এবং বিভ্রান্তির বিষয়। তবে জানা যায় যে সুপ্রিম কোর্ট ২০২০ সালে ক্রিপ্টোকারেন্সির উপর ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে৷ আর এই বিষয়ের প্রবিধানগুলি এখনও বিকশিত হচ্ছে এবং সরকার একটি নিয়ন্ত্রক কাঠামো বিবেচনা করছে৷ তাই, ভারতে ক্রিপ্টোকারেন্সি সংক্রান্ত আইনি পরিবর্তনের সাথে আপডেট থাকা অপরিহার্য।
বর্তমানে ভারতে বিটকয়েনের মালিকানা এবং ব্যবসার বৈধতা কেমন?
ভারতে, বিটকয়েনের মালিকানা এবং লেনদেন বৈধ। কিন্তু এটি লক্ষ করা গুরুত্বপূর্ণ যে দেশে বিটকয়েনকে আইনি দরপত্র হিসাবে বিবেচনা করা হয় না। এর মানে হল যে ব্যক্তিরা বিটকয়েন কিনছেন, বিক্রি করতে এবং ধরে রাখছেন বা হোল্ড করে রাখছেন, তারা এটিকে ভারতীয় রুপির মতো পণ্য ও পরিষেবার বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করতে পারবেন না। এমন অ-আইনি দরপত্রের অবস্থা সত্ত্বেও, বিটকয়েন এবং অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সিগুলির ভারতীয় বিনিয়োগের ল্যান্ডস্কেপে একটি শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে।




