আমরা যখনই অবসরের জন্য সঞ্চয় করি সেই সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হয়ে দাঁড়ায় inflation বা মুদ্রাস্ফীতি। কারণ এই মুদ্রাস্ফীতি শুধুমাত্র যে বর্তমানে টাকার মূল্য হ্রাস করে তা নয়, পাশাপাশি আমাদের ভবিষ্যতে বিভিন্ন অ্যাসেট ক্লাসের মূল্যও ধীরে ধীরে কমিয়ে দেয়। মুদ্রাস্ফীতি কীভাবে টাকার মূল্যে প্রভাব ফেলে জানেন? আপনি বর্তমান পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করে চলেছেন। কিন্তু ভবিষ্যতে যখন অনেক বছর পর আপনি সেই সঞ্চয় রিডিম করবেন, আপনি দেখবেন আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই অর্থের যা মূল্য, ভবিষ্যতে তার মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কম। তাই আপনার যদি মনে হয় আজকের হিসাবে আপনি প্রচুর অর্থ সঞ্চয় করছেন অবসরের জন্য, তাহলে জেনে অবাক হবেন বছর বছর ধরে inflation কিন্তু সঞ্চয়ের মূল্য কমিয়ে আনছে।
অবসরের সঞ্চয়ে মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব:
আপনার রিটায়ারমেন্ট সেভিংসে মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব ব্যাপক হতে পারে। ভারতের মুদ্রাস্ফীতির হার ভবিষ্যতে বহু চাকুরিজীবী বা সাধারণ কোনো ব্যক্তির আয়ের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। একটি উদাহরণের মাধ্যমে ইনফ্লেশনের প্রভাব সম্পর্কে বোঝা যাক। ধরুন, আজকে আপনার কোনো একটি খরচ ৫০০০ টাকায় হতে যায়, কিন্তু যদি আমরা 6% inflation rate ধরি তাহলে সেই একই খরচ করতে আপনার ৫৩০০ টাকা লাগবে ১ বছর পর। আর এইরকম যদি আগামী ৩০ বছর ধরে চলে তাহলে ৫০০০ টাকার খরচ বেড়ে ২৮৭০০ টাকা হয়ে যাবে। অর্থাৎ যে খরচ আপনি আজকে ৫০০০ টাকায় করছেন সেটা করতে ২৮৭০০ টাকা লাগবে ৩০ বছর পর। তাহলে ভাবুন আপনার অবসরের সঞ্চয়ে কতটা প্রভাব পড়তে পারে। আজকে যেই পরিমাণ অর্থ যথেষ্ট মনে হচ্ছে, ২০ বা ৩০ বছর পর তার ভ্যালু কোথায় দাঁড়াবে ভাবুন! সেই কারণে যথাযথ রিটায়ারমেন্ট পরিকল্পনা করা দরকার। কারণ তবেই আপনি inflation-কে পাল্লা দিয়ে সম্পদ বৃদ্ধির সুযোগ পাবেন।
কীভাবে মুদ্রাস্ফীতি থেকে অবসরের সঞ্চয় রক্ষা করবেন?
আমাদের অনেকের জীবনে অবসর এমন একটি সময় যার জন্য আমরা প্রতীক্ষা করে থাকি, এবং এই সময়টি যাতে নির্ঝঞ্ঝাটভাবে আনন্দপূর্ণ উপায়ে কাটানো যায় তার জন্য কিছু কৌশলগত আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। দেখে নেওয়া যাক এমনই কয়েকটি উপায় যা আপনার অবসরের সঞ্চয়কে মুদ্রাস্ফীতি থেকে বাঁচিয়ে রাখবে—
- ইক্যুইটি ইনভেস্টমেন্ট : ইনফ্লেশনকে পাল্লা দেওয়ার পাশাপাশি ভালো রিটার্নের প্রত্যাশাও করছেন? তাহলে অবশ্যই ইক্যুইটি ইনভেস্টমেন্ট করুন। এই ধরনের ইনভেস্টমেন্ট যেমন একদিকে মুদ্রাস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখে, ঠিক তেমনই অন্যদিকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর ভালো রিটার্নের সুযোগও দেয়। তবে মনে রাখতে হবে ইক্যুইটি ইনভেস্টমেন্ট কখনই স্বল্পমেয়াদের জন্য উপযুক্ত নয়। স্বল্পমেয়াদে এই বিনিয়োগ বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে রিটয়ারমেন্ট ফান্ড তৈরির জন্য ইক্যুইটি ইনভেস্টমেন্ট সবচেয়ে ভালো কারণ লংটার্মে ইক্যুইটির ভোলাটিলিটি অনেক কমে যায়। তবে মোট বিনিয়োগের কতটুকু ইক্যুইটি এক্সপোজার হবে সেটি আপনার ঝুঁকি ও লক্ষ্যের উপর নির্ভর করছে। যে-কোনো ইক্যুইটি ইনভেস্টমেন্টর জন্য অবশ্যই আর্থিক উপদেষ্টার পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
- পোর্টফোলিও ডাইভারসিফিকেশন: একই সঙ্গে যদি আপনি বিনিয়োগের থেকে ভালো রিটার্ন পাওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকি কম রাখতে চান তাহলে নিজের পোর্টফোলিওতে বিভিন্ন ধরনের অ্যাসেট অবশ্যই রাখুন যাতে আপনার পোর্টফোলিও ডাইভারসিফাইড থাকে। আপনার পোর্টফোলিওর মধ্যে equity ও debt-এর যেন সঠিক মিশ্রণ থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে মোট ইনভেস্টমেন্টের 30% হওয়া উচিত স্টক বা equity-তে, 30% হওয়া উচিত debt বা bond-এ, 30% real estate-এ এবং বাকি 10% সোনায়। এইভাবে ডাইভারসিফাই করলে ঝুঁকি কম থাকবে এবং রিটার্নও ভালো পাওয়া যাবে। আর এই পদ্ধতি উচ্চ মুদ্রাস্ফীতিতেও আপনার সঞ্চিত অর্থে বিশাল প্রভাব ফেলবে না।
- Emergency fund-এর পুনর্মূল্যায়ন: অনেকে হাতে নগদ রাখতে পছন্দ করেন। তবে মার্কেট থেকে exit নিয়ে নিজের কিছু পরিমাণ সম্পদ নগদে পরিণত করা কখনই উচিত না। কারণ নগদে অনেক তাড়াতাড়ি inflation-এর প্রভাব পড়ে। অনেক বিনিয়োগকারী জরুরি পরিস্থিতির কথা ভেবে নগদ হাতের কাছে রাখেন। সেটি না করে emergency fund যদি FD-তে রাখা যায় তাহলে তার থেকে রিটার্নও বেশি আসবে যা inflation-কে পাল্লা দিতে পারবে।
- Floating rate বন্ড ফান্ডে বিনিয়োগ: Inflation যখন বেশি থাকে সেই সময় এই ধরনের ফান্ড স্বল্পমেয়াদে ভালো রিটার্ন দেয়। তার কারণ হল মুদ্রাস্ফীতি বাড়লে ইন্টারেস্ট রেটও বাড়ে। মুদ্রাস্ফীতির সময়ে স্বল্পমেয়াদের চাহিদা নিয়ন্ত্রণে রাখতে RBI short-term rate বাড়িয়ে দেয়। Floating rate fund সেইসব বন্ডে বিনিয়োগ করে যাদের সুদের হার বেঞ্চমার্ক রেটের সঙ্গে যুক্ত। তাই মুদ্রাস্ফীতি বাড়লে স্বল্পমেয়াদে এই ধরনের বন্ড ফান্ড থেকে অতিরিক্ত আয় করা সম্ভব।
বাজেট নিয়ন্ত্রণ: জিনিসপত্রের দাম বাড়লে প্রতিদিনের খরচেও তার প্রভাব পড়ে। ফলে সেইসময় বাজেট নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন। অপ্রয়োজনীয় জিনিসে খরচ কমিয়ে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সুকৌশলে নিলে ভবিষ্যতে তা ভালো পরিমাণ অর্থ সঞ্চয়ে সাহায্য করবে।





