আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা সবাই সবকিছুই দ্রুত চাই। দীর্ঘ অনুশীলন বা ধৈর্যের বদলে তাই দ্রুততম উপায়ে লক্ষ্যপূরণ করতে চাই আমরা। বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও এমনটাই চায় অনেকে। ফলে স্বল্প সময়ে সর্বাধিক রিটার্ন পাওয়ার পথ আমরা অনেকেই খুঁজি। বিনিয়োগের কথা এলে মূলত দু-ধরনের বিনিয়োগের কথা বিশেষভাবে বলতে হয়– স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। আজকে আমরা স্বল্প বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করব।
স্বল্পকালীন বিনিয়োগের মেয়াদ সাধারণত কয়েক মাসের হতে পারে, তবে মূলত পাঁচ বছরের বেশি হয় না এই প্রকারের বিনিয়োগ। নিকট ভবিষ্যতের কিছু লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্যে স্বল্পমেয়াদের বিনিয়োগগুলি করা হয়। এইপ্রকার বিনিয়োগগুলিকে সহজেই নগদ করা যায়। স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং নির্ভরযোগ্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নিরাপদ আর্থিক সম্পদে এই প্রকার বিনিয়োগ করা হয়ে থাকে। স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগের প্রধান লক্ষ্য হল মূলধন সংরক্ষিত রাখা ও পাশাপাশি সেই মূলধন থেকে ভালো রিটার্ন পাওয়া।
কর্পোরেটগুলির ক্ষেত্রে তারা স্বল্পমেয়াদে তখনই বিনিয়োগ করে যখন বিনিয়োগের ফলে অর্জিত অতিরিক্ত আয় তারা তাদের working capital-এর চাহিদা মেটাতে ব্যবহার করে। অন্যদিকে, বিনিয়োগকারীরা আগামী নিকট ভবিষ্যতের লক্ষ্য যেমন ভ্রমণ বা বাড়ি মেরামত বা কোনো মূল্যবান জিনিস কেনা ইত্যাদি লক্ষ্য পূরণের জন্য স্বল্প মেয়াদে বিনিয়োগ করেন, এর ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যে অর্থের বৃদ্ধিও ঘটে, পাশাপাশি মূলধনও সুরক্ষিত থাকে। অর্থাৎ, স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগের দুটি মূল লক্ষ্য হল, এক, লিক্যুইডিটি প্রদান করা ও দুই, নিকট ভবিষ্যতের চাহিদাগুলি পূরণ করা।
কয়েকটি স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ বিকল্প
ভারতে একাধিক স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগের বিকল্প রয়েছে। তার মধ্যে কয়েকটি জনপ্রিয় বিনিয়োগ নিয়ে আজকে আমরা আলোচনা করব যা আপনার আর্থিক লক্ষ্যগুলি পূরণে সহায়তা করবে।
- রেকারিং ডিপোজিট (RD) : স্বল্পমেয়াদের ভিত্তিতে ভারতে জনপ্রিয় বিনিয়োগের মধ্যে অন্যতম হল রেকারিং ডিপোজিট। আপনি ৬ মাসের জন্যও রেকারিং ডিপোজিট করতে পারেন ও সর্বাধিক ১০ বছরের জন্য করা যেতে পারে RD। সাধারণত রেকারিং ডিপোজিটে ১ মাস থেকে ৩ মাস লক-ইন পিরিয়ড থাকে। লক-ইন পিরিয়ডের আগেই যদি টাকা তুলে নেওয়া হয় তাহলে কোনোপ্রকার সুদ পাওয়া যায় না। রিটার্নের কথায় বলতে হয়, এক একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সুদের হার এক একরকম হয়। তবে ব্যাংকের FD বা স্থায়ী আমানতের ক্ষেত্রে যা সুদ পাওয়া যায় রেকারিং ডিপোজিটে সেই তুলনায় কম সুদ মেলে। বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মোটামুটি 2.5% থেকে 8.5%-এর মধ্যে সুদ প্রদান করা হচ্ছে। সিনিয়র সিটিজেনরা সামান্য বেশি সুদ পান। এই সুদের হার স্থায়ী হয় ও রেকারিং ডিপোজিটে lumpsum অর্থ জমা করতে হয় না। খুব ন্যূনতম অর্থ দিয়েই RD-তে বিনিয়োগ শুরু করা যায় ও নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর টাকা জমা করতে হয়। রেকারিং ডিপোজিটে প্রতি ত্রৈমাসিকে সুদ compounded হয়। রেকারিং ডিপোজিট থেকে আয় করের আওতায় পড়ে, RD থেকে একবছরে যদি ১০,০০০ টাকার বেশি সুদ অর্জিত হয় তাহলে 10% TDS কাটা হবে, আপনার ট্যাক্স স্ল্যাব অনুযায়ী। তবে Form 15H / 15G জমা করে যদি জানানো হয়, আপনি ট্যাক্সেবল স্ল্যাবের আওতায় পড়েন না, তাহলে TDS কাটা হবে না।
- ব্যাংক ফিক্সড ডিপোজিট(FD) : অন্য আরেকটি স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ বিকল্প যা সাধারণের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়, তা হল ব্যাংক ফিক্সড ডিপোজিট। এখানেও আপনি নিশ্চিত রিটার্ন পাবেন। স্থায়ী আমানত বা FD-এর ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ একেবারে ব্যাংকে জমা করতে হয় এবং মেয়াদ শেষে আসলের উপর নির্দিষ্ট রিটার্ন পাওয়া যায়। বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংকে মোটামুটি 6.5% – 7.5% পর্যন্ত সুদ দেওয়া হয় স্থায়ী আমানতে। প্রবীণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে এই সুদের হার কিছুটা বেশি। RD-এর মতো, FD-তেও একটি নির্দিষ্ট সময়ের পরই টাকা তোলা যায়। তবে সময়ের আগে FD ম্যাচিওর করালে পেনাল্টি কাটা হয়। ১ দিন, ৭ দিন, ১৪ দিন, ১ মাস, দেড় মাস থেকে শুরু করে ১০ বছর পর্যন্ত মেয়াদ হতে পারে স্থায়ী আমানতের। করের কোনোরকম ছাড় নেই FD-তে। জমা সুদ আয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আপনার ট্যাক্স স্ল্যাব অনুযায়ী করের আওতায় পড়বে।
- NSC : NSC অর্থাৎ National Saving Certificate হল এমন একটি স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ, যেটিতে কর ছাড়ের সুবিধা পাওয়া যায়। এটি পোস্ট অফিসের একটি বিনিয়োগ প্রকল্প। NSC একটি সরকারি প্রকল্প, ফলে এটিতে বিনিয়োগ সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ও নিশ্চিত রিটার্নও মেলে। প্রতি ত্রৈমাসিকে সুদের হার পুনর্বিবেচনা করা হয় বা পরিবর্তন করা হয়। বর্তমানে সুদের হার রয়েছে 7.7%। প্রকল্পটির মেয়াদ ৫ বছরের। আয়করের 80C ধারার অধীনে বার্ষিক ১.৫ লাখ টাকার উপর করছাড় আছে।
- পোস্ট অফিস টাইম ডিপোজিট : পোস্ট অফিস টাইম ডিপোজিটকে পোস্ট অফিস ফিক্স ডিপোজিটও বলা হয়ে থাকে। এটি একটি অন্যতম সুরক্ষিত স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা যাতে বিনিয়োগকারীরা নিশ্চিত রিটার্ন পান। পোস্ট অফিসের স্কিম হিসেবে গ্রামীণ অঞ্চলে বেশ জনপ্রিয় পোস্ট অফিস টাইম ডিপোজিট। সাধারণত ১ বছর, ২ বছর, ৩ বছর বা ৫ বছরের মেয়াদে টাইম ডিপোজিটে বিনিয়োগ করা যায়। এই প্রকল্পের লিক্যুইডিটি অনেক বেশি তবে ৬ মাস পূর্ণ হওয়ার আগে টাকা কোনোভাবে তোলা যাবে না। ১ বছরের জন্য বিনিয়োগ করলে বর্তমানে 6.9% হারে সুদ মিলবে, ২ বছরের ক্ষেত্রে 7%, ৩ বছরের ক্ষেত্রে 7.1% ও সর্বাধিক ৫ বছরের ক্ষেত্রে 7.5% হারে সুদ মেলে। প্রতি তিন মাস অন্তর সুদের হার পরিবর্তন করা হয়। Time deposit-কে আপনি ঋণের ক্ষেত্রে বন্ধক হিসেবেও ব্যবহার করতে পারবেন। ন্যূনতম ১০০০ টাকা থেকে বিনিয়োগ শুরু করতে পারেন পোস্ট অফিসের টাইম ডিপোজিটে। তবে সুদ করযোগ্য।
- লার্জ ক্যাপ মিউচুয়াল ফান্ড : আরও একটি স্বল্প বিনিয়োগ বিকল্প, যাতে বেশ ভালো রিটার্নও মেলে, সেটি হল লার্জ ক্যাপ মিউচুয়াল ফান্ড। এই ধরনের মিউচুয়াল ফান্ডগুলি লার্জ ক্যাপ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলির স্টকে বিনিয়োগ করে থাকে, যাতে স্বল্প সময়ে বিনিয়োজিত অর্থ ভালো পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। লার্জ ক্যাপ মিউচুয়াল ফান্ডে ভালো ফলাফলযুক্ত বড়ো কোম্পানির স্টকে অধিক পরিমাণে বিনিয়োগ করা হয়। এই ধরনের ফান্ডের ভোলাটিলিটি অন্য মিউচুয়াল ফান্ডের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় এটি বেশ আকর্ষণীয় স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ বিকল্প যাতে অনেক বেশি রিটার্ন পাওয়া যায়। ৩ থেকে ৫ বছরের জন্য লার্জ ক্যাপ মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করতে পারেন। এই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কম ও দেখা গেছে মোটামুটি ৮% থেকে ১৩% পর্যন্ত রিটার্ন মিলেছে লার্জ ক্যাপ ফান্ড থেকে। লার্জ ক্যাপ মিউচুয়াল ফান্ড ২ বছর হোল্ড করার পর বিক্রি করলে ক্যাপিটাল গেইনের উপর 12.5% কর ধার্য হবে। লং টার্ম ক্যাপিটাল গেইনে ১.২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত করছাড় রয়েছে। শর্ট টার্ম ক্যাপিটাল গেইন 20%। এছাড়াও প্রদত্ত ডিভিডেন্ড মোট আয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আয়কর স্ল্যাব অনুযায়ী করের আওতায় পড়বে।
- ডেট মিউচুয়াল ফান্ড : ডেট মিউচুয়াল ফান্ড হল একপ্রকারের মিউচুয়াল ফান্ড যেখানে ডেট সিকিউরিটি অর্থাৎ সরকারি বন্ড, কর্পোরেট বন্ড, কর্পোরেট ডেট সিকিউরিটি, মানি মার্কেট সিকিউরিটি ইত্যাদিতে বিনিয়োগ করা হয়। স্বল্পমেয়াদে ঝুঁকিবিহীন বিনিয়োগ যাঁরা করতে চান এবং পাশাপাশি ভালো রিটার্ন পেতে চান, তাঁদের জন্য ডেট মিউচুয়াল ফান্ড বিনিয়োগের ভালো বিকল্প হতে পারে। সাধারণত ৬ মাস থেকে ৩ বছরের মেয়াদে বা তার বেশি ডেট ফান্ডে বিনিয়োগ করা যায় ও বার্ষিক 8% থেকে 9% পর্যন্ত রিটার্ন মেলে। ডেট ফান্ডে ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স ধার্য করা হয়। এই ফান্ডের ক্ষেত্রে সব ধরনের লাভের জন্যই নিজের ইনকাম ট্যাক্স স্ল্যাব অনুযায়ী কর দিতে হবে।





