আপনি যখনই ব্যাংক বা কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেন অথবা ক্রেডিট কার্ডের জন্য আবেদন করুন, সেই ক্ষেত্রে ঋণ পাওয়া বা ক্রেডিট কার্ড পাওয়ার জন্য আপনার ক্রেডিট স্কোরের অনেকখানি অবদান রয়েছে। কত দ্রুত এবং কতটা নির্ঝঞ্ঝাটে আপনি একটি ঋণ পেতে পারেন ট্যা বলে দেবে এই নম্বরটি। আসুন তবে জানা যাক ক্রেডিট স্কোর কী এবং ক্রেডিট স্কোরে প্রভাব ফেলে এমন বিষয়গুলি কী। তাছাড়াও কীভাবে উন্নত করবেন নিজের ক্রেডিট স্কোর? জেনে নিন।
ক্রেডিট স্কোর কী?
তিন অঙ্কের একটি নম্বর হল ক্রেডিট স্কোর, যা দিয়ে একজন ঋণদাতা আপনার ঋণ বা ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার যোগ্যতাকে যাচাই করে। আপনার ক্রেডিট রিপোর্টে পূর্বে নেওয়া ক্রেডিটের ভিত্তিতে ক্রেডিট ব্যুরো এই স্কোরটি ক্যালকুলেট করে। সেই কারণে আপনি নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত লোনের অনুমোদন পেতে চাইলে আপনাকে যথাযথ ক্রেডিট স্কোর বজায় রাখতে হবে।
তবে জানেন কি কীভাবে ঠিক রাখা যায় ক্রেডিট স্কোর? কোন বিষয়গুলি প্রভাব ফেলে ক্রেডিট স্কোর গণনার ক্ষেত্রে? চলুন জেনে নিই ঋণদাতা কোন বিষয়গুলি দেখে নির্ধারণ করেন আপনি সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন কিনা।
→ অতীতের পেমেন্ট : ক্রেডিট কার্ড, ব্যক্তিগত ঋণ, গৃহঋণ ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের ঋণের রেকর্ডকে পেমেন্ট রেকর্ড বলা হয়। এখন, আপনি যদি কোনো ঋণ দেরিতে শোধ করেন বা কোনোপ্রকার ঋণ প্রদানে ব্যর্থ হন অথবা অর্থসংকটে ভোগেন ইত্যাদি, সবই এই পেমেন্ট রেকর্ডে উল্লেখ থাকে। অর্থাৎ, বর্তমান ঋণের পেমেন্ট সংক্রান্ত আপনার যাবতীয় আচরণ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে উল্লেখ থাকে এই রেকর্ডে। এবার, পেমেন্টের পরিমাণ, পেমেন্টের সময়, কতবার আপনি পেমেন্ট করতে ব্যর্থ হয়েছেন ইত্যাদি মানদণ্ডের মূল্যায়ন করে ক্রেডিট স্কোর। ফলে যেহেতু অতীতের এই পেমেন্ট সংক্রান্ত রেকর্ড আপনার ঋণ প্রাপ্তির যোগ্যতা বিচার করে, তাই ক্রেডিট স্কোর গণনার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।
→ ক্রেডিট ইউটিলাইজেশন রেশিও (CUR) : CUR বা Credit Utilisation Ratio-কে শতকরায় প্রকাশ করা হয়। আপনি আপনার মোট প্রাপ্য ক্রেডিটের থেকে যতটা অংশ ব্যবহার করেছেন তার শতকরা হিসাবই হল CUR। 30%-এর ওপর যত বেশি হবে এই পার্সেন্টেজ, তত আপনার ক্রেডিট স্কোর কমবে। যদি আপনি চান নিজের ক্রেডিট স্কোর বাড়াতে, বা অন্তত চান যাতে কমে না যায়, তাহলে নিজের মোট ক্রেডিট লিমিটের 30% – 40%-এর বেশি কখনই ব্যবহার করবেন না।
→ ঋণের সংখ্যা : আপনি কত ধরনের কটি ঋণ নিয়েছেন বা আপনার নামে কটি ক্রেডিট কার্ড আছে সেই বিষয়টি আপনার ক্রেডিট স্কোরে প্রভাব ফেলে। আপনার গৃহঋণ, ব্যক্তিগত ঋণ, ক্রেডিট কার্ড ইত্যাদি মিলিয়ে ক্রেডিট অ্যাকাউন্ট যত বেশি থাকবে, স্কোর তত বেশি হবে। তবে সেটি ততক্ষণই হবে যতক্ষণ আপনি সময়মতো ঋণ পরিশোধ করছেন। ঋণের সংখ্যা বেশি হলে ক্রেডিট স্কোর বেশি হয় কারণ এতে বোঝা যায় আপনি লোন এবং ক্রেডিট কার্ডের মতো একাধিক ঋণ একইসঙ্গে চালাতে পারেন।
→ ক্রেডিট মিক্স : আপনার লোন পোর্টফোলিওতে সিকিওরড ও আনসিকিওরড ঋণের সংমিশ্রণ আপনার ক্রেডিট স্কোরে অনেকটা প্রভাব ফেলে। সিকিওরড বা সংরক্ষিত ঋণ হল যেটিতে আপনাকে কোনো কিছু জামানত বা বন্ধক রাখতে হয় না, আর অন্যদিকে অসংরক্ষিত বা আনসিকিওরড লোন কোনো জামানত ছাড়াই পাওয়া যায়। সিকিওরড লোনে যেহেতু আপনাকে collateral জমা রাখতে হয়, তাই এই লোনের প্রভাব কম পড়ে ক্রেডিট স্কোরে। তবে কোনোভাবে ঋণ পরিশোধে যদি ব্যর্থ হন সেটি আপনার ক্রেডিট স্কোরে প্রভাব ফেলবে এবং ক্রেডিট রিপোর্টে নেতিবাচকভাবে উল্লেখ থাকবে।
→ ক্রেডিট ইনকোয়ারি : আপনি কি নিজের ক্রেডিট রিপোর্ট জানতে বারবার একাধিক ক্রেডিট অ্যাপ্লিকেশন জমা করেন? তাহলে সেটি ঋণদাতার কাছে ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে। ঋণদাতা ভাবতে পারে আপনি অতিরিক্ত ক্রেডিট ব্যবহার করছেন, যার কারণে আপনার ঋণের আবেদন বাতিল হতে পারে। সেইজন্য যখন সত্যিই আপনার ঋণের প্রয়োজন হবে শুধু তখনই নিজের ক্রেডিট রিপোর্ট কেমন সেটি জানার জন্য আবেদন জমা করুন, একাধিকবার নয়।
নিয়মমতো ৩০০ থেকে ৯০০— এই সীমার মধ্যেই থাকে ক্রেডিট স্কোর। এই স্কোর ৩০০ থেকে ৬৫০-এর মধ্যে হলে খারাপ স্কোর বোঝায় এবং ৮০০ বা তার বেশি থাকলে দুর্দান্ত স্কোর বোঝায়।
এতক্ষণ আমরা ক্রেডিট স্কোরের ওপর প্রভাব ফেলে এমন কয়েকটি বিষয় সম্পর্কে জানলাম। এবার দেখে নেওয়া যাক কয়েকটি উপায় যা আপনার ক্রেডিট স্কোরকে উন্নত করবে। মনে রাখতে হবে, রাতারাতি ক্রেডিট স্কোর বাড়ানো সম্ভব না। তার জন্য নিয়মানুবর্তিতা ও ধারাবাহিকতা প্রয়োজন।
- সময়মতো পেমেন্ট : আপনি ব্যক্তিগত ঋণের EMI নিয়মমতো এবং সময়মতো পেমেন্ট করেন কিনা দেখে নিন। আপনি যদি ধার্য দিনের আগে প্রতিবার EMI বা ক্রেডিট বিল দিয়ে থাকেন তাহলে সেটি আপনার আর্থিক দায়িত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দেয় এবং ক্রেডিট রেটিং বাড়ে। অন্যদিকে একটিমাত্র পেমেন্টের ব্যর্থতা ক্রেডিট স্কোরে প্রচুর প্রভাব ফেলে।
- ক্রেডিট কার্ডের বিল সম্পূর্ণ প্রদান করুন : যখনই ক্রেডিট কার্ডের বিল প্রদান করবেন, মনে রাখবেন শুধু ন্যূনতম অ্যামাউন্ট নয়, সম্পূর্ণ অ্যামাউন্ট প্রদান করুন। এতে যেমন বেশি ইন্টারেস্ট চার্জ এড়ানো যাবে, একইভাবে আপনার ক্রেডিট পাওয়ার যোগ্যতা বাড়বে।
- ক্রেডিট ব্যবহার সীমিত রাখুন : ক্রেডিট কার্ডের লিমিট যাই থাকুক, কখনই সম্পূর্ণ লিমিট শেষ করে ফেলবেন না। কখনই 30% – 40%-এর বেশি লিমিট শেষ করা ঠিক নয়। এতে ধারণা হয়, আপনি ক্রেডিটের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল এবং এর ফলে ক্রেডিট স্কোরে প্রভাব পড়ে। সেই জন্য CUR অর্থাৎ Credit Utilization Ratio কম রাখাই ভালো।
- অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া থেকে বিরত থাকুন : একাধিক ক্রেডিট কার্ড, বিশাল অঙ্কের ঋণ ইত্যাদি আপনাকে সহজেই ঋণগ্রস্ত করে দিতে পারে। সেই কারণে অর্থগত চাপ না ফেলে যেই পরিমাণ অর্থ সহজেই আপনি পরিশোধ করতে পারবেন সেইটুকুই ঋণ নেওয়া বাঞ্ছনীয়।
পরিশেষে বলা যায়, যে-কোনো ঋণেই ঝুঁকি জড়িত থাকে। নিজের আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী ঋণ নেওয়া একান্ত প্রয়োজন। তার পাশপাশি ক্রেডিট স্কোর ও ক্রেডিট রিপোর্ট কীভাবে ভালো রাখবেন সেই বিষয়গুলো জানলে ঋণগ্রস্ত হওয়া থেকে মুক্ত হওয়া যায়।





