ভারতে শুরুর সময় থেকেই মিউচ্যুয়াল ফান্ড ভারতীয়দের জন্য লাভজনক প্রমাণিত হয়েছে। এর diversified বৈশিষ্ট্যের জন্য বিনিয়োগকারীদের কাছে বেশ জনপ্রিয় বিনিয়োগ বিকল্প এটি। তবে অন্যান্য যে-কোনো বিনিয়োগের মতো এটিতেও কিছু ঝুঁকি আছে। ভারতে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইতিহাস দেখলে দেখা যাবে, ১৯৬৩-তে RBI প্রথম মিউচ্যুয়াল ফান্ড আনে যার নাম ছিল UTI (Unit Trust of India)। এর প্রথম স্কিমটির নাম ছিল US-64 (Unit Scheme)। শুরুর পর থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত স্কিমটিতে ২৫ মিলিয়নের বেশি বিনিয়োগকারী ইনভেস্ট করেছিলেন। US-64 ছিল সবচেয়ে বড় ফান্ড এবং ১৪০০০ কোটিরও বেশি ক্যাপিটাল বেস ছিল স্কিমটির। স্কিমটি বার্ষিক 9% থেকে প্রায় 22% পর্যন্ত রিটার্ন দিয়েছিল।
বছরের পর বছর ধরে ভারতীয় ফান্ডগুলি কোটি কোটি ভারতীয়দের সম্পদ গঠনে সাহায্য করেছে। চলুন দেখা যাক মিউচ্যুয়াল ফান্ডের শুরুর সময়টি।
মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইতিহাস
মিউচ্যুয়াল ফান্ডের চলার পথ সবসময় মসৃণ ছিল না। কারণ মিউচ্যুয়াল ফান্ড একটি market-linked ইন্সট্রুমেন্ট। অতীতে ভারতীয়রা স্থির আয়ের বিনিয়োগে বেশি বিশ্বাসী ছিলেন। সেখান থেকে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মতো বিনিয়োগে মানুষের ঝোঁক বাড়ল কীভাবে জানতে হলে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের বিবর্তন প্রক্রিয়াটি জানতে হবে।
১৯৬৪–১৯৮৭ :
US-64 ছিল প্রথম মিউচ্যুয়াল ফান্ড স্কিম যেটি ১৯৬৪তে লঞ্চ করেছিল। UTI-এর নিয়ন্ত্রণ ১৯৭৮ পর্যন্ত ছিল RBI-এর কাছে, তারপর UTI-এর নিয়ন্ত্রণ RBI থেকে IDBI(Industrial Development Bank of India)-এর কাছে চলে যায়। প্রথম মিউচ্যুয়াল ফান্ড হিসেবে ভারতীয় ছোটো বিনিয়োগকারীদের কাছে বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল এই ফান্ডটি। ১৯৮৮ পর্যন্ত UTI-এর পরিচিতি অনেক বেড়ে যায় এবং ফান্ডটির টোটাল অ্যাসেট আন্ডার ম্যানেজমেন্ট (AUM) দাঁড়ায় ৬৭০০ কোটি টাকা।
১৯৮৭–১৯৯৩ :
প্রথম পাবলিক সেক্টর ব্যাংক হিসেবে SBI মিউচ্যুয়াল ফান্ড ইন্ডাস্ট্রিতে পথ চলা শুরু করে ১৯৮৭-এ। LIC(Life Insurance Company) ও GIC(General Insurance Corporation of India) ছিল প্রথম পাবলিক সেক্টর সংস্থা যারা মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ব্যবসায় প্রবেশ করেছিল। LIC ১৯৮৯ সালে ও GIC ১৯৯০ সালে তাদের মিউচ্যুয়াল ফান্ড লঞ্চ করে। এরপর ১৯৯২ পর্যন্ত PNB, Indian Bank, Bank of India, Bank of Baroda ইত্যাদি PSU-গুলি মিউচ্যুয়াল ফান্ড স্কিম চালু করে। ১৯৯৩ সালের শেষের দিকে মিউচ্যুয়াল ফান্ড ইন্ডাস্ট্রির মোট AUM দাঁড়ায় ৪৭০০৪ কোটি টাকায়।
১৯৯৩–২০০৩ :
এই সময়ের মধ্যে বেসরকারি সংস্থাগুলিও এই ইন্ডাস্ট্রিতে প্রবেশ করা শুরু করে। ১৯৯২ সালের এপ্রিল মাসে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে SEBI গঠিত হয়। তারপর থেকে একাধিক প্রাইভেট অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ব্যবসায় প্রবেশ করে। ১৯৯৩ সালে Franklin Templeton Mutual Fund প্রথমবারের জন্য SIP স্কিম লঞ্চ করে।
২০০৩–২০১৪ :
এই সময়ে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় বেশ কিছু সংস্কার করে SEBI এবং বিনিয়োগকারীদের এই ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে জ্ঞান বৃদ্ধিতে জোর দেয়। এই সময় থেকেই সুসংগঠিত হতে থাকে মিউচ্যুয়াল ফান্ড ইন্ডাস্ট্রি, ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ে। NFO বা New Fund Offer-এর প্রক্রিয়া চালু হয় এই সময়ে, এবং অনেক ফান্ডের স্কিম consolidate করা হয়।
২০১৪– বর্তমান সময় :
Regular plan-এর পাশাপাশি direct plan চালু হয়। এই সময়ের মধ্যেই মিউচ্যুয়াল ফান্ডে investing ও পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্টের জন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলি বৃদ্ধি পেতে থাকে।
মিউচ্যুয়াল ফান্ডের বৃদ্ধি সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য :
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের ৩০ তারিখ পর্যন্ত হিসেবে ভারতের মিউচ্যুয়াল ফান্ড ইন্ডাস্ট্রির AUM অর্থাৎ Asset Under Management ছিল ৬৭.০৯ লাখ কোটি টাকা, গত ১০ বছরের নিরিখে প্রায় ৬ গুণ বেশি।
জুন ২০২৩-এ নেট AUM ছিল ৪৪.৩৯ লাখ কোটি টাকা, যা এই বছর জুনে 38% বেড়ে হয়েছে ৬১.১৬ লাখ কোটি টাকা।
২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথমবার এই ইন্ডাস্ট্রির AUM ৫০ লাখ কোটি টাকার গণ্ডি ছাড়ায়।
ভারতে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ভবিষ্যৎ :
ICRA-র অ্যানালাইসিস অনুযায়ী আগামী ২ থেকে ৩ বছরে AUM ১০০ লাখ কোটি টাকা ছাড়াবে। ভারতীয় বিনিয়োগ বাজার ক্রমশ বাড়ছে এবং ভারতের অর্থনীতির বৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সাহায্য করছে, ফলে রিটেইল ইনভেস্টররা মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন। ২০২০ সালের মহামারীর পর থেকে বৈশ্বিক বাণিজ্য যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে তাতে ভারতে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ভবিষ্যত নিশ্চিতভাবে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পেতে চলেছে। বর্তমানে ৪৫ টি ফান্ড হাউস আছে ভারতে, তার মধ্যে মাত্র ১৪ টির AUM ১ লক্ষ কোটি বেশি। ফলে ভবিষ্যতে ইন্ডাস্ট্রিটির বৃদ্ধির সম্ভাবনা যে বেশি তাতে সন্দেহ নেই। যারা নতুন নতুন ইন্ডাস্ট্রিতে প্রবেশ করছে, সেইসব কোম্পানিগুলির কাছে প্রচুর সুযোগ রয়েছে।
শেষে বলা যায়, SEBI বেশ অনেকগুলি মাপকাঠি এনেছে যাতে এই ক্ষেত্রের স্বচ্ছতা বজায় থাকে। যার কারণে বিনিয়োগকারীরাও অংশগ্রহণ বাড়াচ্ছেন।




