আমরা যখন ব্যাংকে টাকা জমা করি বা ব্যাংক থেকে টাকা তুলি, সেই সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্যের জন্য আমরা ব্যাংক পাসবইয়ের ওপর নির্ভর করি। কখন ও কোথায় টাকা ডেবিট হয়েছে, কখন কার থেকে টাকা ব্যাংকে ক্রেডিট হয়েছে এবং কোনো নির্দিষ্ট দিনে ব্যাংকের ব্যালেন্স কত ইত্যাদি সব তথ্য ব্যাংক পাসবইতে থাকে। এমনকি জমা টাকার ওপর কত সুদ পাওয়া গেল সেই বিষয়েও জানা যায় ব্যাংক পাসবই থেকে। একটা সময় ছিল যখন আমরা অনেকেই ব্যাংকে গিয়ে মাসে মাসে পাসবই আপডেট করিয়ে আনতাম যাতে সমস্ত তথ্য আমাদের আয়ত্তে থাকে। সেই সময় বেশির ভাগ সঞ্চয় বা বিনিয়োগ আমাদের ব্যাংকের মাধ্যমেই করতে হত। তবে আজকের দিনে টাকা সঞ্চয়ের বা বিনিয়োগের একাধিক উপায় রয়েছে। তার মধ্যে একটি উপায় হল মিউচ্যুয়াল ফান্ড।
মিউচ্যুয়াল ফান্ড কী? মিউচ্যুয়াল ফান্ড আর কিছুই না বরং একটি বিনিয়োগ মাধ্যম যেখানে বিভিন্ন বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে টাকা বা ফান্ড নিয়ে ইক্যুইটি, গোল্ড, ডেট ইত্যাদি আলাদা আলাদা অ্যাসেটে ইনভেস্ট করা হয়। এবং সেই নির্দিষ্ট স্কিমের বিনিয়োগ কৌশল মেনে এই ইনভেস্টমেন্ট করা হয়। মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের প্রচুর সুবিধা রয়েছে, তার মধ্যে অবশ্যই diversification অন্যতম একটি সুবিধা, যেখান ঝুঁকি কমানো সম্ভব। এছাড়া দক্ষ ফান্ড ম্যানেজারের মাধ্যমে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে, lump sum অথবা SIP-র মাধ্যমে বিনিয়োগ করা যেতে পারে। আর আপনি যদি SIP নির্বাচন করে বিনিয়োগ করতে চান তাহলে ১০০ টাকার মতো ন্যূনতম অর্থ দিয়েও বিনিয়োগ শুরু করতে পারেন। ফলে এত সুবিধা থাকার কারণে মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের। তবে ব্যাংকের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যেমন পাসবই থেকে সমস্ত ট্র্যাক রাখা যায়, ঠিক সেইভাবে মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের সময় আপনাকে ফান্ডটির বিষয়ে জানতে হবে, রিটার্ন কতটা জেনারেট হল সেটা দেখতে হবে। আর এইসব তথ্য জানতে আপনাকে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের স্টেটমেন্ট দেখতে হবে।
মিউচ্যুয়াল ফান্ডের স্টেটমেন্ট আসলে কী?
ঠিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট স্টেটমেন্ট যেমনটি হয়, মিউচ্যুয়াল ফান্ডের স্টেটমেন্টও সেইরকমই। আপনার মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিনিয়োগের যাবতীয় তথ্যাদি দেয় এই স্টেটমেন্ট। আপনি যদি কোনো নির্দিষ্ট ফান্ড হাউসের স্টেটমেন্ট চান তাহলে সেই ফান্ড আপনার আলাদা আলাদা স্কিমের সমস্ত বিনিয়োগের সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত একটি বিবরণ দেবে এই স্টেটমেন্টে। তবে আপনি রেজিস্ট্রার বা ডিপোজিটরির থেকে consolidated account statement (CAS) অর্থাৎ মিউচ্যুয়াল ফান্ডে আপনার সমস্ত বিনিয়োগ সম্পর্কে জানতে চাইলে সব ফান্ড হাউসের, সব বিনিয়োগের বিবরণ জানতে পারবেন।
মিউচ্যুয়াল ফান্ড স্টেটমেন্টে কী কী থাকে?
যদিও একেক ফান্ডের ফরম্যাট একেকরকম হয়, তবে মোটামুটি নিম্নলিখিত বিষয়গুলি স্টেটমেন্টে থাকে—
- Folio number : যখন আপনি মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করবেন সেইসময় আপনাকে একটি অদ্বিতীয় ফোলিও নম্বর দেওয়া হবে যেটা আপনার মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের পরিচয় বহন করবে। সাধারণত স্টেটমেন্টের ওপরে ডান দিকে এটি লেখা থাকে।
- স্টেটমেন্ট পিরিয়ড : ফোলিও নম্বরের কাছেই সাধারণত স্টেটমেন্ট পিরিয়ড উল্লেখ করা থাকে। সেই নির্দিষ্ট সময়ে যে transaction-গুলি হয়ে থাকে, তার উল্লেখ থাকে স্টেটমেন্ট পিরিয়ডে।
- আপনার ব্যক্তিগত তথ্য : স্টেটমেন্টের এই অংশে আপনার পুরো নাম, ঠিকানা, যোগাযোগের নম্বর, জন্মের তারিখ, ইমেইল, এবং আপনি একক বিনিয়োগকারী নাকি যৌথ বিনিয়োগকারী সেই তথ্য লেখা থাকে। এখানে অনেকসময় প্যান নম্বরেরও উল্লেখ থাকে।
- নমিনেশন : কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার অবর্তমানে যে ব্যক্তি সমস্ত অর্থ দাবি করতে পারেন, তিনি হলেন নমিনি। নমিনেশন সেকশনটিতে লেখা থাকবে আপনি সেই বিনিয়োগের জন্য নমিনি নির্ধারণ করেছেন কি না।
- ডিস্ট্রিবিউটর ডিটেইল : যদি আপনি কোনো advisor বা ডিস্ট্রিবিউটরের মাধ্যমে মিউচ্যুয়াল ফান্ড করিয়ে থাকেন তাহলে এই অংশে সেই বিষয়ে উল্লেখ থাকবে। আর যদি আপনি এমন কোনো মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে না করিয়ে থাকেন তাহলে ‘Direct’ কথাটি লেখা থাকবে।
- ব্যাংক ডিটেইল : এই অংশে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর, ব্যাংকের নাম, IFSC code ইত্যাদির উল্লেখ থাকে।
- Transaction ডিটেইল :
→ স্কিম : এখানে যে স্কিমে বিনিয়োগ করেছেন তার নাম লেখা থাকবে।
→ transaction date : যে দিনে transaction হয়েছে সেটি লেখা থাকবে।
→ NAV : NAV বা net asset value হল ফান্ডের একটি ইউনিটের মূল্য।
→ NAV date : বাজার বন্ধের পর প্রতিদিন মিউচ্যুয়াল ফান্ড স্কিমের NAV গণনা করা হয়। যে দিন আপনি ইউনিট কেনেন বা বেচেন, সেই দিনের হিসেবে NAV ক্যালকুলেট করা হয়।
- Transaction type : এই অংশে বলা থাকে আপনি কোনো নতুন ইনভেস্টমেন্ট করেছেন কিনা বা রিডিম করেছেন কিনা এবং আপনার ইনভেস্টমেন্টের ধরন কী সেটির উল্লেখ থাকে।
→ Lump sum : নির্দিষ্ট কোনো থোক টাকা ফান্ডে বিনিয়োগ বা ফান্ড থেকে রিডিম করা।
→ SIP : প্রতি মাসে, বা ৬ মাস অন্তর নির্দিষ্ট টাকা ফান্ডে বিনিয়োগ।
→ STP : আপনি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা একটি ফান্ড থেকে অন্য ফান্ডে বিনিয়োগ করলে সেটিকে Systematic Transfer Plan বা STP বলে।
→ SWP : পূর্বনির্ধারিত সময়ের ব্যবধানে কোনো ফান্ড থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা তোলা হলে সেটি উল্লেখ থাকবে।
- Amount : আপনি কতটা অর্থ বিনিয়োগ করেছেন এবং টাকা তুলেছেন সেটি লেখা থাকবে।
- ইউনিট : কত ইউনিট আপনি কিনেছেন বা বিক্রি করেছেন সেটি উল্লেখ থাকবে। এছাড়া transaction-এর দিন NAV কত ছিল সেটিও বলা থাকবে।
- বর্তমান মূল্য : এখানে আপনার বিনিয়োগের বর্তমান বাজার মূল্যের উল্লেখ থাকবে।
- বর্তমান দাম : আপনি আসলে কতটা অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন তার উল্লেখ থাকবে।
Load : আপনার ফান্ড হাউস যদি কোনো সেল চার্জ বা কমিশন ধার্য করে তার উল্লেখ থেকে এখানে।





