গত বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে ২০০টি নতুন ফান্ড অর্থাৎ New Fund Offer (NFO) লঞ্চ হয়েছিল এবং তার মধ্যে শুধুমাত্র সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ৫০টি স্কিম লঞ্চ হয়েছে। রিটেল বা খুচরো বিনিয়োগকারীদের কাছে এই ধরনের NFO-তে বিনিয়োগ করার বিষয়টি খুব সাধারণ, কারণ যে দামে NFO লঞ্চ হয় তা বিনিয়োগকারীদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়।
তবে সবসময়ের জন্য এটি সত্যি নাও হতে পারে। আর্থিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন বিনিয়োগকারীদের এই বিষয়ে খুব বেশি উৎসাহ না দেখানোই ভালো এবং স্কিম লঞ্চের সময়ে বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকা উচিত। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন একটি স্কিম, যেটি ইতিমধ্যে বাজারে উপস্থিত এবং যার ফলাফলের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, যেটি মার্কেটের একাধিক বুল ও বিয়ার রান অতিক্রম করে এসেছে, মার্কেটের মনোভাব সম্পর্কে যে ফান্ড অভ্যস্ত, সেটি NFO-র তুলনায় অধিক বিনিয়োগযোগ্য।
NFO কেন সবক্ষেত্রে বিনিয়োগের জন্য উপযোগী নয়?
1. ফলাফল সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই: NFO-র প্রথম এবং প্রধান সমস্যা যা বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগকালে সম্মুখীন হন, তা হল, ফান্ডগুলির কোনো পাস্ট পারফরমেন্স থাকে না। ফলে স্কিমটি ভবিষ্যতে কেমন পারফর্ম করবে তার বিষয়ে বিনিয়োগকারীরা বিশেষ কিছু জানতে পারেন না। তাছাড়াও, অনেক ফান্ড হাউস যখন নতুন কোনো স্কিম লঞ্চ করে তখন সেটি এমন স্টকে বিনিয়োগ করে যেখানে হয়তো বিনিয়োগকারীর অন্যান্য স্কিমের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই এক্সপোজার আছে। NFO-তে বিনিয়োগের আগে তাই দেখে নেওয়া প্রয়োজন কোন কোন স্টকে বিনিয়োগ করছে স্কিমটি। যদি আপনার বিনিয়োগ করা স্কিমে সেই স্টকগুলি ইতিমধ্যেই থেকে থাকে তাহলে নতুন করে NFO-তে বিনিয়োগ এড়িয়ে চলাই উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। NFO-র কোনো ট্র্যাক রেকর্ড না থাকায় সেগুলিকে মূল্যায়ন করা বেশ কষ্টসাধ্য।
মিউচ্যুয়াল ফান্ড একটি দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় প্রকল্প। তবে এই বিনিয়োগেও মার্কেটের ঝুঁকি এবং ম্যানেজমেন্ট-সংক্রান্ত ঝুঁকি থাকে। সেই কারণে মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিনিয়োগের আগে তার ফিচার, ফান্ডের পারফরমেন্স, ফান্ডের ধরন, আর্থিক লক্ষ্যের সঙ্গে খাপ খায় কিনা ইত্যাদি জেনে তারপর বিনিয়োগ করা উচিত। আর এই সমস্ত অ্যানালাইসিস নতুন একটি ফান্ডের ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। সেই কারণে NFO-তে বিনিয়োগ তুলনায় অধিক ঝুঁকি বহন করে।
2. সেক্টরভিত্তিক বিনিয়োগ প্রবণতা: অপর একটি অসুবিধা যা NFO-তে বিনিয়োগের সময়ে বিনিয়োগকারীরা সম্মুখীন হতে পারেন, তা হল কোনো ফান্ড, বিশেষত সেক্টোরাল বা থিমেটিক ফান্ড, শুরু বা লঞ্চ করার সময়টি সঠিক না-ও হতে পারে। অনেক ফান্ড হাউস এমন সময় NFO লঞ্চ করে যখন ইতিমধ্যে কোনো বিশেষ থিম নিজের সর্বোচ্চ সীমায় থাকে। ফলে এই ধরনের থিমেটিক ফান্ডের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হয়তো সহজ বিষয় কারণ তাঁরা মনে করেন এই থিম বা সেক্টর যখন বর্তমানে এত ভালো রিটার্ন দিচ্ছে তখন ফান্ডটিও ভালো রিটার্ন দেবে। কিন্তু যেহেতু সেই মুহূর্তে থিমটি নিজের সর্বোচ্চ রিটার্নের দিকে রয়েছে তাই পরবর্তীতে সেই থিমে কিছু correction দেখা দেবে ও রিটার্ন কমে আসবে। ফান্ডের ক্ষেত্রেও একই বিষয় ঘটবে। লঞ্চের সময়ে দুর্দান্ত রিটার্ন দিলেও ভবিষ্যতের রিটার্ন কিন্তু সীমিত থাকবে। ফলস্বরূপ বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী রিটার্ন মিলবে না।
একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি বোঝা যাক। ধরুন, কোনো বিশেষ সেক্টর যেমন IT, energy, defence ইত্যাদি বর্তমানে ভালো ফলাফল করছে। একটি ফান্ড হাউস, যাদের এই সেক্টরের কোনো ফান্ড নেই, মনে করল তারা একটি NFO লঞ্চ করবে, যা এর মধ্যে কোনো একটি সেক্টরকেন্দ্রিক হবে। তবে এই কৌশল সবসময় যে দুর্দান্ত রিটার্ন দেবে এমন নয়। NFO লঞ্চের সময়কাল এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। একটি সেক্টর বা থিমের trend যখন প্রায় শেষের দিকে সেই মুহূর্তে ফান্ড লঞ্চ হলে লং রানে ভালো রিটার্ন আসবে না।
3. NAV দেখে বিনিয়োগ করবেন না:
অনেক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি ভ্রান্ত ধারণা আছে যে, প্রাথমিক NAV অর্থাৎ যে NAV-তে কোনো ফান্ড বর্তমানে অ্যাভেলেবল সেটি IPO-র সময়ে স্টকের ইস্যু প্রাইসের মতো। কিন্তু এটি আদৌ সত্যি নয়। অনেক বিনিয়োগকারীদের ধারণা কোনো NFO-র যদি ১০ টাকা লঞ্চ প্রাইস হয় তাহলে সেটি সস্তা দামে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। একটি ফান্ড কেমন পারফর্ম করবে তা রিটার্নের উপর নির্ভর করছে, NAV-র উপর নয়। যেমন, একটি ফান্ড যার NAV ২০ টাকা, সেটি যদি বেড়ে ২৪ টাকা হয় তাহলে ফান্ডের রিটার্ন 20%। অন্যদিকে, অপর একটি ফান্ড যার NAV ১০ টাকা, বেড়ে যদি ১১ টাকা হয় তাহলে মাত্র 10% রিটার্ন দিয়েছে ফান্ডটি। সুতরাং NAV দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। কিছু ক্ষেত্রে কোনো NFO ভালো পারফর্ম না করতে পারলে লঞ্চ প্রাইসের থেকেও NAV কমে যায় ও বিনিয়োগকারীদের আর্থিক ক্ষতি হয়।
মিউচ্যুয়াল ফান্ডের সঠিক মূল্যায়ন করতে হলে ফান্ডের স্টক বাছাই ও ফান্ডের ম্যানেজমেন্ট সম্পর্কে জানতে হবে। NFO-ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে ভালো ফল করতে পারে। যেমন, যদি কোনো ফান্ড হাউস emerging কোনো trend বা business যেমন digitalisation, healthcare advancement ইত্যাদি new-age ব্যবসার স্টক নিয়ে একটি NFO লঞ্চ করে তাহলে সেটি ভালো ফলাফলের সুযোগ দিতে পারে। একথা ঠিক যে NFO-র historical data সম্পর্কে কিছু জানা যায় না, তা সত্ত্বেও ফান্ডের ম্যানেজমেন্ট দেখে কিছুটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
সেইজন্য বলা যায়, বিনিয়োগকারীরা যদি NFO-তে বিনিয়োগ করতে চান তাহলে ফান্ডের বিনিয়োগ কৌশল, ফান্ডের অন্তর্গত স্টক, expense ratio ইত্যাদি দেখে তাঁদের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।





