বিশ্বের যে কোনো শেয়ার মার্কেটের ক্ষেত্রে ভোলাটিলিটি সম্ভবত সবচেয়ে অনিশ্চিত একটি বিষয়। ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাবলি, সরকারের পলিসি, বিনিয়োগকারীদের সেন্টিমেন্ট ইত্যাদি একাধিক কারণে শেয়ারের দাম ও স্টক মার্কেট সূচক দ্রুত ওঠানামা করে।
এমনভাবে যখন নির্দিষ্ট একটি সময় ধরে শেয়ারের দাম উপরে উঠতে থাকে অর্থাৎ বাড়তে থাকে, তাকে Bull Market বলা হয়। অন্যদিকে, স্টক মার্কেটে শেয়ারের দাম কমতে থাকলে সেটিকে bear market বলা হয়। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করতে হলে আপনাকে অবশ্যই বুল ও বিয়ার মার্কেটের এই ওঠানামা সম্পর্কে জানতে হবে যাতে দাম বৃদ্ধির সুযোগগুলি এবং দাম কমে যাওয়ার সমস্যাগুলি সঠিকভাবে পরিচালনা করা যায়। আজকের আলোচনায় আমরা জানব বুল মার্কেট কী, কেন হয় এটি, বুল মার্কেট হলে মার্কেটের ফলাফল কেমন হয় এবং এই সময় কী স্ট্র্যাটেজি ফলো করা প্রয়োজন।
Bull Market কাকে বলে?
শেয়ার বাজার সম্পর্কে যেসময় বিনিয়োগকারীরা আশাবাদী হন এবং শেয়ারের দাম যখন বাড়তে থাকে তখন আর্থিক বাজারে দীর্ঘসময় ধরে একটি uptrend লক্ষ করা যায়। একে bull market বলে। এই আশাবাদী মনোভাবের কারণে buying activity অর্থাৎ ক্রয় বেড়ে যায় এবং ক্রমাগত দাম বৃদ্ধির চক্র চলতে থাকে।
কখন bull market হবে বা কোন মার্কেটকে বুল মার্কেট বলা যায়, তার নির্দিষ্ট বা সর্বজনবিদিত কোনো মেট্রিক হয় না। তবে সাধারণভাবে বলা হয়, পরপর বেশ কয়েকটি ট্রেডিং সেশন জুড়ে যদি শেয়ারের দাম 20%-এর উপর ওঠে তখন সেই সময়কে বুল মার্কেট বলে।
কী দেখে ধারণা পাওয়া যাবে বাজারে bull run চলছে?
- ক্রমাগত শেয়ারের দাম বৃদ্ধি: বুল মার্কেট বোঝার সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হল বিভিন্ন সেক্টরে ক্রমাগত শেয়ারের দামের বৃদ্ধি। তবে এমনটা নয় যে, বুল রান চলার সময়ে বাজারে কখনোই নিম্নমুখিতা দেখা যাবে না। বুল মার্কেটের অর্থ হল অধিকাংশ স্টকের দাম বৃদ্ধির ফলে শেয়ার বাজারের সামগ্রিক ঊর্ধ্বগতি, যা দেশের আর্থিক উন্নতিকে বোঝায়।
- উচ্চ ট্রেডিং ভলিউম: বুল বাজারে বিনিয়োগকারীরা অধিক ভলিউমে ট্রেড করে থাকেন। একাধিক সেক্টরের স্টকের চাহিদা বাড়তে থাকে। পরিবর্তে শেয়ারের দাম বৃদ্ধি পায়।
- বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস: আরও একটি বিষয় যা দেখে বুল মার্কেটের বৈশিষ্ট্য বোঝা যায়, সেটি হল বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস। যখন বিনিয়োগকারীরা আশাবাদী হন যে আগামী ২-৩ মাসে স্টকগুলির দাম বাড়বে, সেই সময় তাঁরা অতিমাত্রায় স্টক কিনতে থাকেন। ফলে শেয়ারের লিক্যুইডিটি বাড়ে এবং শেয়ারের দাম বাড়তে থাকে।
- মার্কেট ভোলাটিলিটি কমে: বিয়ার মার্কেট অর্থাৎ যখন দাম কমতে থাকে সেই তুলনায় বুল মার্কেটে ভোলাটিলিটি কম দেখা যায়। ফলে দামের একটি স্থায়িত্ব তৈরি হয় এবং বিনিয়োগকারীদের মনে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়।
তবে জানেন কি কেন মার্কেটে বুল রান হয়?
বুল রানের পেছনে একাধিক কারণ থাকে। আমরা তার মধ্যেই কয়েকটি নিয়ে আলোচনা করব। যেমন–
→ আর্থিক সম্প্রসারণ: সারা বিশ্বে ক্রমাগত অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ ঘটলে সাধারণত শেয়ার বাজারেও বুল রান দেখা যায়। ব্যবসার উন্নয়ন, কর্মী ছাটাই হ্রাস এবং গ্রাহকের ক্রয়ক্ষমতা ইত্যাদি কারণে ইক্যুইটি বাজার বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। ২০২০-তে অতিমারির পরপর চার বছর এই কারণবশত শেয়ার বাজারে একটি বুল রান দেখা গিয়েছিল।
→ Interest rate কমে যাওয়া: রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার মতো কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলি তাদের মনিটরি এবং লেন্ডিং পলিসি সময় সময় পরিবর্তন করে, যাতে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। RBI যখন সুদের হার কমিয়ে দেয় সেইসময় borrowing এবং spending বেড়ে যায়। ফলে বাজারে কেনাবেচা বেড়ে যায়।
→ কর্পোরেট বৃদ্ধি: কর্পোরেট কোম্পানিগুলির ফলাফল মার্কেটে বুল রানের পেছনে অনেকাংশে দায়ী। ফলাফল ভালো হলে বাজারের প্রতি আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায় এবং বিনিয়োগকারীরা ইক্যুইটি বাজারে কেনার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। এতে শেয়ারের দামও বেড়ে যায়।
বুল মার্কেটে বিনিয়োগকারীদের কেমন স্ট্র্যাটেজি মেনে কেনাবেচা করতে হবে?
বিনিয়োগকারীদের কাছে বেশ আকর্ষণীয় হল বুল মার্কেট। তবে তার মধ্যেও বেশ কিছু সতর্কতা মেনে ট্রেডিং করা উচিত। কখনোই overtrading বা overinvesting করা উচিত নয়।
→ বাজার যখন ঊর্ধ্বমুখী হবে, অবশ্যই কোনো একধরনের স্টক বা একধরনের অ্যাসেট ক্লাসে বিনিয়োগ করে যাওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন একটি diversified portfolio-র। পোর্টফোলিও ডাইভারসিফাই থাকলে নির্দিষ্ট কোনো অ্যাসেট বা সেক্টরের সঙ্গে জড়িত ঝুঁকি কমে।
→ প্রতিদিনের বাজার-সংক্রান্ত খবরাখবরের মাধ্যমে নিজেকে আপডেট রাখুন এবং নিজের পোর্টফোলিও উপর নজর রাখুন।
→ ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বুল মার্কেটেও অবশ্যই স্টপলস সেট করুন।
→ অতিরিক্ত ক্রয় করা হয়েছে এমন স্টক বা overvalued স্টক কেনা থেকে বিরত থাকা উচিত। বিনিয়োগকারীরা অনেকসময়ে ধরে নেন positive trend হয়তো চলতেই থাকবে। কিন্তু আসলে তেমনটা হয় না। সেই কারণে overvalued stock কিনলে bull market-এর সময়ে দাম কমতে কমতে কেনা দামের থেকেও অনেকটা নীচে নেমে যায়, তখন বিনিয়োগকারীদের প্রভূত আর্থিক ক্ষতি হয়।
বুল মার্কেট উচ্চ মুনাফার সুযোগ দেয় ঠিকই কিন্তু সেই সময়েও যথেষ্ট বিচক্ষণ হয়ে ইনভেস্ট করা উচিত। ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রেখে ট্রেড করলে সঠিক ইনভেস্টমেন্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় এবং লং রানে ভালো মুনাফা অর্জন করা সম্ভব হয়।





