আমরা সবাই জানি জীবন বড়ই অনিশ্চিত, এবং ভবিষ্যৎ কেমন হতে চলেছে সেটি আগে থেকে অনুমান করা কঠিন। সেইজন্য ভবিষ্যতের যে-কোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকা দরকার। পরিবারের একজনের জীবনের অনিশ্চয়তা পুরো পরিবারের অর্থনীতিতে প্রবল চাপ সৃষ্টি করে। ফলে এত ধরনের অনিশ্চয়তা এড়াতে আমাদের সকলের প্রয়োজন একটি এমারজেন্সি ফান্ডের, যাতে যে-কোনো পরিস্থিতির জন্য আমরা প্রস্তুত থাকি।
এমারজেন্সি ফান্ড কী?
জরুরি অবস্থার কথা মাথায় রেখে অল্প অল্প করে অর্থ জমিয়ে যে ফান্ড তৈরি করা হয় তাকে এমারজেন্সি ফান্ড বলে। কর্মবিচ্যুতি, বেতন কমে যাওয়া, চিকিৎসার খরচ মেটানো ইত্যাদি জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয় এই ফান্ড। অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে ব্যাংক বা অন্য খাতে অর্থ সঞ্চিত থাকলেও দীর্ঘসময় চালানোর জন্য সেটি যথেষ্ট নাও হতে পারে। কারণ মনে করুন কোনো ব্যক্তি চাকরি থেকে ছাটাই হয়েছেন এমন পরিস্থিতিতে তাঁকে নিজের অন্যান্য খরচ যেমন EMI, জরুরি বিল, দৈনন্দিন খরচ ইত্যাদি সবই চালাতে হবে। ফলে নতুন চাকরি না পাওয়া অবধি যাতে এই খরচগুলি মেটাতে পারা যায় সেইজন্য প্রয়োজন এমারজেন্সি ফান্ডের।
তবে এত অনিশ্চিয়তা থাকার পরেও বহু পরিবারের এমারজেন্সি ফান্ড থাকে না। মনে রাখবেন যে-কোনো বিনিয়োগের আগে প্রথমেই আপনাকে এই ফান্ডটি প্রস্তুত রাখতে হবে। সুতরাং অন্যান্য আর্থিক লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগে অবশ্যই একটি এমারজেন্সি ফান্ড তৈরি রাখা দরকার।
এমারজেন্সি ফান্ডে কতটা অর্থ রাখা উচিত?
এমারজেন্সি ফান্ড কতটা রাখা উচিত সেটি প্রত্যেকের মাসিক খরচের উপর নির্ভর করে। তবে নিয়ম অনুযায়ী মোটামুটি প্রতি মাসের খরচের ৬ থেকে ৯ গুণ অর্থ এমারজেন্সি হিসেবে সরিয়ে রাখা উচিত। যেমন— আপনার প্রতিমাসে ২০,০০০ টাকা বিভিন্ন খাতে খরচ হয়ে থাকে তাহলে ২০ হাজার টাকার ৬ থেকে ৯ গুণ অর্থাৎ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত এমারজেন্সি ফান্ড হিসাবে রাখা উচিত।
এখানে মনে রাখতে হবে আগের উদাহরণে আমরা যে ২০ হাজার টাকা খরচ ধরেছি তার মধ্যে EMI, ইনসিওরেন্স প্রিমিয়াম সহ যাবতীয় খরচ ধরতে হবে। দেখে মনে হতে পারে এই ১.৫ – ২ লাখ টাকা একটা বড় অঙ্ক এবং একবারে এই পরিমাণ অর্থ সরিয়ে রাখা সবার ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। সেইজন্য প্রতিমাসে যদি অল্প অল্প করে অর্থ আপনি এমারজেন্সি হিসেবে রাখতে পারেন তাহলে ফান্ড তৈরি করতে বিশেষ অসুবিধে হবে না।
কীভাবে তৈরি করবেন এমারজেন্সি ফান্ড?
আমরা এখন জেনে নেব কীভাবে মাসে মাসে স্বল্প সঞ্চয়ের মাধ্যমে এমারজেন্সি ফান্ড তৈরি করা যায়। তবে তার আগে জানতে হবে এমারজেন্সি ফান্ড তৈরি করা যায়। তবে তার আগে জানতে হবে এমারজেন্সি ফান্ড আপনি কোথায় রাখবেন। যেহেতু এমারজেন্সি ফান্ড অত্যন্ত জরুরি একটি ফান্ড, এটিকে আমরা ইক্যুইটি বা ইক্যুইটি মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মতো ভোলাটাইল জায়গায় রাখব না। বরং কম ঝুঁকি বহন করে এমন অ্যাসেটে রাখা উচিত এই ফান্ড। যেমন –
- সেভিংস অ্যাকাউন্ট: সাধারণত সেভিংস অ্যাকাউন্টে কোনো অর্থ থাকলে আমাদের প্রবণতা থাকে বারবার টাকা তুলে নেওয়ার। সেইজন্য যদি সেভিংস অ্যাকাউন্টে একান্তই রাখতে চান তাহলে এমারজেন্সি ফান্ডের জন্য পৃথক একটি অ্যাকাউন্ট রাখুন। বর্তমানে 3.5% – 4% সুদ পাওয়া যায় সেভিংস অ্যাকাউন্টে। যদি আপনি প্রতি মাসে ৫০০০ টাকা করে সেভিংস অ্যাকাউন্টে রাখেন তাহলে ৩ বছর পর আপনার এমারজেন্সি ফান্ড তৈরি হবে। এখানে ধরে নেওয়া হচ্ছে আপনার প্রতি মাসের খরচ ২০,০০০ টাকা।
- রেকারিং ডিপোজিট: রেকারিং ডিপোজিট এমারজেন্সি ফান্ড রাখার জন্য উপযুক্ত একটি মাধ্যম। এখানে মোটামুটি 4%-6% রিটার্ন পাওয়া যায়। এখানে প্রতি মাসে ৫০০০ টাকা রাখলে এবং 6% ইন্টারেস্ট যদি আপনি পান তাহলে ২.৫ বছরে আপনার এমারজেন্সি ফান্ড তৈরি হবে।
- ফিক্সড ডিপোজিট: ফিক্সড ডিপোজিটে আপনি প্রতিমাসে অল্প অল্প ফান্ড জমা করতে পারবেন না। বরং আপনার কাছে যদি lump sum অর্থ থাকে তাহলে সেটি আপনি FD করে রেখে দিতে পারেন এমারজেন্সি ফান্ড হিসাবে।
- লিক্যুইড ফান্ড: এমারজেন্সি ফান্ড তৈরির সবচেয়ে ভালো উপায় হল লিক্যুইড ফান্ড। Liquid fund হল এক ধরনের debt fund যেখানে এমন বন্ডে বিনিয়োগ করা হয় যাদের মেয়াদ থাকে ৯১ দিন পর্যন্ত। লিক্যুইড ফান্ড একাধারে কম ঝুঁকিসম্পন্ন, পাশাপাশি স্থায়ী আমানত অর্থাৎ ফিক্সড ডিপোজিটের তুলনায় বেশি রিটার্ন পাওয়া যায়।
- আল্ট্রা শর্ট ডিউরেশন ফান্ড: ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিটের তুলনায় সামান্য বেশি রিটার্নের সুযোগ এবং সমান ঝুঁকি বহন করে আল্ট্রা শর্ট ডিউরেশন ফান্ড। এবং সবচেয়ে সুবিধাজনক বিষয়টি হল এই ফান্ড লিক্যুইড ফান্ডের মতোই অত্যন্ত লিক্যুইড অর্থাৎ সহজে টাকা তোলা যায়। আপনি প্রতি মাসে SIP-র মাধ্যমে এই ফান্ডে টাকা জমা করতে পারেন। যদিও জেনে রাখুন, লিক্যুইড ফান্ড বা আল্ট্রা শর্ট ডিউরেশন ফান্ড অর্থাৎ ডেট ফান্ডগুলি কিন্তু FD বা RD-র মতো স্থায়ী রিটার্ন দেয় না।




