ভারতীয় শেয়ার বাজারে যেন IPO-র জোয়ার! প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন কোম্পানি শেয়ার বাজারে প্রবেশ করছে এবং এতসব নতুন কোম্পানির মধ্যে সঠিক কোম্পানি বেছে বিনিয়োগ করা বেশ কঠিন। ২০২৪ সালে ভারতে মোট ৩২৭টি IPO লঞ্চ হয়েছে যা দেশের IPO market-এর মধ্যে রেকর্ড-ব্রেকিং একটি বছর। এই সংখ্যা আমেরিকার IPO-র সংখ্যার তুলনায়ও বেশি যা গতবছর ছিল ১৮৩টি।
২০২৪ সালে IPO-র মাধ্যমে ১.৮ লাখ কোটি টাকা সংগ্রহ হয়েছে। বাজারে এত সংখ্যক IPO থাকার অর্থ হল বিনিয়োগকারীদের প্রচুর IPO থেকে উপযুক্তটি নির্বাচন করতে হবে। তবে একটি বেছে নেওয়া কঠিন। আজকে আমরা আলোচনা করব একজন বিনিয়োগকারী আইপিওতে বিনিয়োগ করার সময় কোন জিনিসগুলি অবশ্যই খেয়াল রাখবেন।
আইপিও কী?
কোনো কোম্পানি IPO বা Initial Public Offering তখনই জনগণের উদ্দেশ্যে অফার করে যখন কোম্পানিকে প্রথমবারের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে হয়। বিনিয়োগকারীরা IPO-র মাধ্যমে আগে অংশীদারিত্বও অর্জনের সুযোগ পান, এই আশায় যে এর থেকে চটজলদি মুনাফা করা যাবে অথবা লং টার্মে এর থেকে গ্রোথ হবে।কোম্পানি নিজেদের এক্সপেন্সেস অর্থাৎ সম্প্রসারণ, রিসার্চ, ঋণ পরিশোধ বা অন্যান্য প্রয়োজনে IPO থেকে সংগৃহীত ফান্ড ব্যবহার করে।
কীভাবে কাজ করে আইপিও?
→ প্রথমে কোম্পানি নিজেদের আইপিও ঘোষণা করে এবং তার প্রাইস রেঞ্জ বা মূল্যসীমা স্থির করে।
→ আগ্রহী বিনিয়োগকারীরা প্রস্তাবিত মূল্যে শেয়ারের জন্য bid করেন।
→ এই পুরো পদ্ধতিটি যাতে স্বচ্ছ থাকে, তার জন্য নজরদারি করে শেয়ার বাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা SEBI।
→ চাহিদা ও আবেদনের নির্ভুলতার ওপর নির্ভর করছে একজন বিনিয়োগকারী শেয়ারের allotment পাবেন কিনা।
→ আইপিও-র সময় শেয়ার লটে ইস্যু করা হয়, আলাদা আলাদাভাবে নয়।
→ বাজারে আইপিও-র চাহিদার ভিত্তিতে ফেস ভ্যালু থেকে অফার প্রাইস আলাদা হতে পারে।
→ আইপিও oversubscribed হওয়ার অর্থ হল যতগুলি শেয়ার অফার করা হয়েছে, তার তুলনায় চাহিদা বা ডিমান্ড বেশি। আবার অন্যদিকে, under-subscribed হওয়ার অর্থ, শেয়ারের সাবস্ক্রিপশন কম হয়েছে অর্থাৎ শেয়ারের চাহিদা কম।
আইপিওতে আবেদন করার সময় কী কী খেয়াল করবেন?
আইপিও থেকে বিনিয়োগকারীরা মুনাফা লাভ করতে পারেন, তবে যে-কোনো আইপিওতে বিনিয়োগ করা সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। সেই কারণে আইপিওতে বিনিয়োগের আগে বিচক্ষণতার সঙ্গে আইপিওর মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
- প্রসপেক্টাস দেখা : কোনো কোম্পানি যখন আইপিওর জন্য আবেদন জমা করে, তখন কোম্পানিটিকে SEBI-র নির্দেশ অনুযায়ী একটি প্রসপেক্টাস জমা করতে হয়, এটিতে কোম্পানি সম্পর্কে তথ্যাদি থাকে। এই তথ্যের মাধ্যমে কোম্পানির বিস্তারিত বিবরণ, যেমন কোম্পানির আর্থিক পরিস্থিতি, লক্ষ্য, পরিচালন ব্যবস্থা, ঝুঁকি এবং আসন্ন আইপিও সম্পর্কে তথ্যাদির উল্লেখ থাকে। কোম্পানির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং ঝুঁকি সম্পর্কে জানা যায় এই তথ্য থেকে।
- কোম্পানির আর্থিক সচ্ছলতা দেখা : কোম্পানির আর্থিক পরিস্থিতি দেখা প্রয়োজন। ক্যাশ ফ্লো, ডেট টু ইক্যুইটি রেশিও, P/E ratio, P/B ratio ইত্যাদি প্যারামিটারগুলি দেখা দরকার। কোম্পানির আর্থিক পরিস্থিতির বিবরণ DRHP অর্থাৎ Draft Red Herring Prospectus-এ পাওয়া যায়। ফলে কোম্পানির আগের ফলাফল, রেভিনিউ, কোম্পানির লাভের পরিমাণ, ঋণের পরিমাণ ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। যে কোম্পানির ফিনান্সিয়াল ট্র্যাক রেকর্ড ভালো এবং সচ্ছল সেটি বেশি স্টেবল হিসেবে ধরা হয়।
- কোম্পানির উদ্দেশ্য : কোম্পানি আইপিওর মাধ্যমে যে অর্থ সংগ্রহ করছে সেটি কীভাবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছে কোম্পানি, সেটি দেখা প্রয়োজন। কোম্পানি যদি সেই অর্থ ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ বা বৃদ্ধি যেমন রিসার্চ এবং ডেভেলপমেন্ট, টেকনোলজি, বা নতুন ব্যবসা অধিগ্রহণ ইঙ্গিত দেয় যে কোম্পানিটি বৃদ্ধির দিকে এগোচ্ছে, অন্যদিকে, যদি কোম্পানি আইপিওতে সংগৃহীত অর্থ ঋণ পরিশোধ, বা এমন কোনো খরচের ক্ষেত্রে ব্যবহার করে যেখানে কোম্পানির বৃদ্ধির কোনো যোগ নেই তাহলে বুঝতে হবে সেই আইপিওতে বিনিয়োগ সঠিক সিদ্ধান্ত নয়।
- জনগণের চাহিদা এবং বাজারের ধারণা : আইপিও সম্পর্কে জনগণের আগ্রহ থাকাটা জরুরি। কোনো আইপিও oversubscribed হলে বোঝা যায় কোম্পানিটির চাহিদা বেশি এবং বিনিয়োগকারীরা কোম্পানিকে নিয়ে আশাবাদী। আর অন্যদিকে, আইপিও under-subscribed হওয়ার অর্থ দাঁড়ায় বিনিয়োগকারীরা কম আগ্রহী। ফলে এই ধরনের ক্ষেত্রে বিবেচনা করে বিনিয়োগ করা দরকার।
- কোম্পানির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা : ভবিষ্যতে বৃদ্ধির জন্য কোম্পানির কৌশল কী, জানা দরকার। কোম্পানির অভিনব উদ্যোগ, সম্প্রসারণ পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ, এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে টিকে থাকার কৌশল ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা দেয়।
- ম্যানেজমেন্ট ও প্রোমোটার : কোম্পানির ম্যানেজমেন্ট দল ও প্রমোটারদের অভিজ্ঞতা এবং বিশ্বস্ততা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। কোম্পানির নেতৃত্ব বা লিডারশিপ যদি উন্নত হয় তাহলে ভালো সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব, যা পরোক্ষভাবে কোম্পানির বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
- Valuation analysis : আইপিওর ভ্যালুয়েশন, মার্কেটে উপস্থিত সমগোত্রীয় অন্য কোনো কোম্পানির ভ্যালুয়েশনের সঙ্গে তুলনা করে বোঝা যায় আইপিও-টি overvalued আছে নাকি ন্যায্য দাম রয়েছে। P/E ratio, P/S ratio ইত্যাদি মেট্রিক থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির তুলনায় আইপিওর ভ্যালুয়েশনের ধারণা পাওয়া যায়।
- মার্কেট পরিস্থিতি : কোন সময় আইপিও লঞ্চ হচ্ছে সেটি দেখাও একান্ত দরকার। বুলিশ মার্কেটে সাধারণত আইপিও সফল হতে দেখা যায়। অন্যদিকে মার্কেট যদি bearish থাকে, তাহলে আইপিও থেকে শর্ট টার্ম লাভ পাওয়া সম্ভব হয় না।
ফলে আমরা বুঝলাম, আইপিও বেশ একাধিক সুবিধে নিয়ে আনলেও এতে বিনিয়োগ করতে যথেষ্ট বিচক্ষণতা প্রয়োজন। কোম্পানির আর্থিক পরিস্থিতি, ভবিষ্যৎ বৃদ্ধি, ম্যানেজমেন্টের দক্ষতা, ভ্যালুয়েশন ইত্যাদি জানা একান্ত দরকার।




