বিনিয়োগের সঙ্গে ঝুঁকি এবং রিটার্ন— দুটি বিষয়ই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। সাধারণত যে বিনিয়োগগুলির ঝুঁকি কম সেগুলি কম রিটার্ন জেনারেট করে আবার বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ থেকে রিটার্ন বেশি পাওয়ার সম্ভাবনা অধিক থাকে। রিটার্ন কম থাকলে যেমন মুদ্রাস্ফীতিকে টেক্কা দেওয়া সম্ভব নয়, তেমনই বেশি রিটার্নের আশায় ঝুঁকিও অনেকটা বেড়ে যায়। সেইজন্য প্রয়োজন সঠিক অ্যাসেট অ্যালোকেশনের, যেখানে সম্ভাব্য রিটার্নের নিশ্চয়তা তো আছেই তাছাড়া অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত ঝুঁকি এড়ানো যায়।
অ্যাসেট অ্যালোকেশন কী?
আমরা জানি প্রতিটি অ্যাসেটের নিজস্ব কিছু ঝুঁকি আছে। ফলে আমরা অর্থ বিনিয়োগ করার সময় যদি সমস্ত বিনিয়োগ কোনো এক ধরনের অ্যাসেটে করে ফেলি তাহলে অবাঞ্ছিত ঝুঁকি বেড়ে যায়। সেই কারণে রিটার্ন ও ঝুঁকির মধ্যে সাম্যতা এনে ইক্যুইটি, ডেট, গোল্ড, রিয়াল এস্টেট ইত্যাদি অ্যাসেট ক্লাসে বিনিয়োগ diversify করাকে অ্যাসেট অ্যালোকেশন বলে। ফলে যখন আপনি একাধিক অ্যাসেট ক্লাসে বিনিয়োগ করবেন তখন একটির পারফরমেন্স অন্যটির পারফরমেন্সকে প্রভাবিত করবে না, অর্থাৎ কোনো একটির উপর নির্ভরযোগ্যতা তৈরি হবে না। ফলত যদি কোনো একটি অ্যাসেট খারাপ ফল করে সেটির প্রভাব অনেকটা কমে আসবে যদি অন্য অ্যাসেটগুলির ফলাফল ভালো হয়।
কেন অ্যাসেট অ্যালোকেশন জরুরি?
→ আমাদের বিনিয়োগ বেশ কিছু কারণে প্রভাবিত হয়, যেমন মার্কেট নিম্নমুখী হলে প্যানিক বা ভীতি থেকে অনেকেই শেয়ার বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন আবার বেশি রিটার্নের লালসায় বিনিয়োগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তবে আপনি যদি নিজের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা, আর্থিক লক্ষ্য এবং বিনিয়োগের মেয়াদ অনুযায়ী সঠিকভাবে অ্যাসেট অ্যালোকেশন করেন তাহলে এই ধরনের অযৌক্তিক মানসিকতা আপনার বিনিয়োগে প্রভাব ফেলবে না।
→ ইক্যুইটি থেকে রিটার্ন পাওয়ার সম্ভাবনা সবথেকে বেশি। তবে equity investment সবথেকে বেশি ভোলাটিলিটির সম্মুখীন হয়। এবার আপনি যদি ইক্যুইটির পাশাপাশই অন্য কম ঝুঁকি ও কম অস্থির অ্যাসেট ক্লাসে বিনিয়োগ করেন তাহলে ঝুঁকির মধ্যে ব্যালেন্স বা ভারসাম্য তৈরি হয়। যেমন debt investment-এর কথা যদি ধরেন, দেখা যাবে বাজারের অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেও stable return দিতে পারে debt asset, আবার গোল্ড বা সোনা সমস্ত investment portfolio hedge করে অর্থাৎ ঝুঁকি কমিয়ে diversify করে।
→ প্রতিটি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা নির্দিষ্ট মেয়াদ অনুযায়ী বিনিয়োগ করি, যেমন স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি। Equity investment যেহেতু স্বল্পমেয়াদে বেশি ভোলাটাইল তাই এইরকম বিনিয়োগ আমরা সাধারণত long-term-এর জন্য করি। আবার debt investment স্বল্পমেয়াদের লক্ষ্যগুলি পূরণের জন্য সবচেয়ে ভালো বিকল্প। আবার emergency fund-ও অনেকে liquid fund-এর মতো debt fund-এ বিনিয়োগ করেন। ফলে আপনি যদি আপনার বিনিয়োগে equity, debt ও অন্যান্য অ্যাসেট ক্লাসের মধ্যে সঠিকভাবে অ্যালোকেশন করতে পারেন তাহলে আপনার একটি ব্যালেন্স পোর্টফোলিও তৈরি হবে যার সাহায্যে আপনি স্বল্পমেয়াদের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যগুলিও পূরণ করতে পারবেন।
কীভাবে সঠিক অ্যাসেট অ্যালোকেশন করবেন?
সঠিক অ্যাসেট অ্যালোকেশন করতে হলে নিম্নলিখিত বিষয়গুলি খেয়াল রাখতে হবে–
আর্থিক লক্ষ্য : অ্যাসেট অ্যালোকেশন কেমন হবে তা আপনার আর্থিক লক্ষ্যের উপর নির্ভর করছে। আর্থিক লক্ষ্য স্থির না করেই বিনিয়োগ করলে সেই বিনিয়োগের কোনো অর্থই থাকে না। যেমন আপনি যদি আগামী ১-২ বছরের মধ্যে কোনো লক্ষ্য পূরণের জন্য বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেন আপনার জন্য debt fund-এ বিনিয়োগ সবথেকে ভালো বিকল্প হবে। আবার আগামী ৫ বছর বা তার পরের কোনো লক্ষ্য পূরণের জন্য equity fund বেছে নেওয়া যেতে পারে কারণ ইক্যুইটির ভোলাটিলিটি দীর্ঘমেয়াদে থাকে না। সুতরাং নিজের লক্ষ্যের উপর নির্ভর করে আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন যে কত টাকা বিনিয়োগ করবেন, সম্ভাব্য রিটার্ন কত হবে এবং কোন অ্যাসেটে বিনিয়োগ করবেন।
ঝুঁকি : বিনিয়োগের সঙ্গে ঝুঁকির সম্পর্কের কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। প্রতিটি বিনিয়োগেরই নিজস্ব ঝুঁকি রয়েছে। নিজের নিজের ঝুঁকি গ্রহণের প্রবণতা অনুযায়ী বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। যদি আপনি বাজারের অতিরিক্ত ঝুঁকি নিতে রাজি থাকেন তাহলে আপনি equity fund-এ বিনিয়োগের কথা ভাবতে পারেন। অন্যদিকে যদি আপনার বয়স বেশি হয় এবং ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা কম থাকে তাহলে আপনার পক্ষে debt fund-এ বিনিয়োগ উপযুক্ত হবে। অর্থাৎ আপনার আর্থিক পরিস্থিতি কী, আপনি জীবনের কোন পর্যায়ে রয়েছেন ইত্যাদি বিষয় নির্ধারণ করবে আপনি কতটা ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।
মেয়াদ : আপনি যদি দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের কথা চিন্তা করে থাকেন যেখানে বাজারের স্বল্পমেয়াদি উঠানামার প্রভাব থাকবে না তাহলে আপনি equity-র মতো aggressive বিনিয়োগ করতে পারেন। অন্যদিকে আপনার বিনিয়োগের মেয়াদ যদি short-term হয়ে থাকে তাহলে আপনাকে তুলনায় stable return জেনারেট করে এমন বিনিয়োগ বেছে নিতে হবে, যেখানে বাজারের ওঠানামার প্রভাব কম।
কীভাবে মিউচ্যুয়াল ফান্ডে অ্যাসেট অ্যালোকেশন করবেন?
Equity, debt ও gold-এর মধ্যে ভারসাম্য রেখে যদি আপনি বিনিয়োগ করেন তাহলে আপনার মিউচ্যুয়াল ফান্ড পোর্টফোলিওতে অ্যাসেটের সঠিক অ্যালোকেশন করা সম্ভব। আপনাকে শুধুমাত্র নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিটি ক্লাসের সঠিক স্কিম বাছতে হবে। প্রথমেই আপনাকে ৬-৯ মাসের খরচ emergency fund হিসেবে কোনো liquid fund-এ রাখতে হবে। এরপর বাকি অর্থ equity ও gold-এর মধ্যে allocate করা যেতে পারে।
তবে মনে রাখতে হবে সবার ক্ষেত্রে একইরকম স্ট্র্যাটেজি কাজে লাগবে না, কারণ প্রত্যেক বিনিয়োগকারীর লক্ষ্য, ঝুঁকি আলাদা আলাদা হয়। সেইজন্য আপনার বয়স, বিনিয়োগের উদ্দেশ্য, আর্থিক পরিস্থিতি বুঝে কতটা আপনি equity-তে বিনিয়োগ করবেন, কতটা debt-এ কতটা gold-এ সেটা ঠিক করতে হবে। এবং আপনার আর্থিক পরিস্থিতি বা বিনিয়োগ লক্ষ্যে কোনোরকম পরিবর্তন হলে সেই অনুযায়ী পোর্টফোলিওতে অ্যাসেটের rebalancing অবশ্যই করতে হবে।





