আর্থিক বাজারে মুনাফা অর্জনের দুটি ভিন্ন উপায় হল ট্রেডিং এবং ইনভেস্টিং। একজন ইনভেস্টর বা বিনিয়োগকারী হলেন সেই ব্যক্তি যিনি সিকিউরিটি দীর্ঘ সময় ধরে হোল্ড করেন অর্থাৎ তিনি একজন দীর্ঘমেয়াদি খেলোয়াড়। অন্যদিকে ট্রেডার হলেন সেই ব্যক্তি যিনি বাজারে সিকিউরিটির দামের ওঠানামায় প্রভাবিত হন।
তবে দুটির মধ্যে সাদৃশ্য হল, দুটিতেই আর্থিক সম্পদ, যেমন, স্টক, ETF, বন্ড ইত্যাদি কেনা হয় নিজের সম্পদ বৃদ্ধির আশায়।
আজকের আমরা আলোচনা করব ইনভেস্টিং এবং ট্রেডিং কী এবং এদের মধ্যে মূল পার্থক্য কী। এছাড়াও কাদের ট্রেড করা উচিত এবং কাদের ইনভেস্ট।
ইনভেস্টিং কী?
ইনভেস্টিং-এর অর্থ হল যখন আপনি দীর্ঘসময়ের জন্য অতিরিক্ত আয় বা মুনাফার জন্য স্টক কেনেন। বিনিয়োগের ফলে আপনি আপনার অর্থ এক জায়গায় রেখে দেন যেখান থেকে ভবিষ্যতে ভালো রিটার্ন আসার সম্ভাবনা থাকে। যাঁরা বিনিয়োগ বা ইনভেস্টিং করেন তাঁরা মূলত কোম্পানির ফান্ডামেন্টাল অ্যানালাইস করে এবং লং টার্মে কোম্পানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা বুঝে বিনিয়োগ করেন।
কয়প্রকারের ইনভেস্টিং হয়?
বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন ধরনের ইনভেস্টিং করে থাকেন। যেমন—
1. অ্যাক্টিভ ইনভেস্টিং : অ্যাক্টিভ ইনভেস্টিং-এর অর্থ হল যেখানে ফান্ড বা পোর্টফোলিও পরিচালনা হয় দক্ষ পেশাদার ফান্ড ম্যানেজার দ্বারা এবং এই কাজের জন্য ফান্ড ম্যানেজারের একটি ফি বরাদ্দ থাকে। যেহেতু দক্ষ ব্যক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়, তাই এই ফি অনেকসময়ই বেশি হয়।
2. প্যাসিভ ইনভেস্টিং : প্যাসিভ ইনভেস্টিং-এ কোনো পেশাদার ফান্ড ম্যানেজার নিযুক্ত থাকেন না। বিনিয়োগকারীরা নিজেরাই নিজেদের পোর্টফোলিও ম্যানেজ করেন। প্যাসিভ ইনভেস্টিং-এর খরচ তুলনায় কম হয় কারণ এখানে ম্যানেজমেন্ট ফি থাকে না।
3. ভ্যালু ইনভেস্টিং : ভ্যালু ইনভেস্টিং-এ বিনিয়োগকারীরা সেইসব কোম্পানিতেই বিনিয়োগ করেন যেগুলি ইতিমধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত, এবং যে কোম্পানিগুলির শেয়ারের দাম কম ভোলাটাইল। ভ্যালু ইনভেস্টিং-এ বিনিয়োগকারীরা নিজেদের অর্থের এক্সপোজার উচ্চ ঝুঁকির কোম্পানিতে করতে চান না, বরং তাঁরা historical data এবং performance দেখে স্টেবল কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেন।
4. গ্রোথ ইনভেস্টিং : গ্রোথ ইনভেস্টিং-এ অতিরিক্ত ঝুঁকি জড়িত থাকে, যেহেতু এই বিনিয়োগের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা নিজেদের মূলধনের ওপর বেশি রিটার্ন আশা করেন। গ্রোথ ইনভেস্টররা হাই রিটার্নের পাশাপাশি হাই গ্রোথ-যুক্ত কোম্পানিতে বিনিয়োগ করতে চান। এই ধরনের বিনিয়োগে কিছু ঝুঁকি যুক্ত থাকে এবং সেই কারণে বিনিয়োগের আগে সেই ঝুঁকির বিষয়ে বোঝা প্রয়োজন।
ট্রেডিং কী?
ট্রেডিং হল কম সময়ে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ১ দিন বা ১ সপ্তাহের জন্য স্টক বা অন্যান্য সিকিউরিটি কেনা। ট্রেডিং-এর মূল উদ্দেশ্য হল স্বল্প সময়ে ভালো রিটার্ন জেনারেট করা। যেমন ধরুন, একজন ইনভেস্টর যদি বছরে 15%–20% রিটার্ন জেনারেট করে, সেখানে একজন ট্রেডার প্রতি মাসে 15% পর্যন্ত রিটার্ন জেনারেট করতে পারেন। তবে ইন্ট্রাডে ট্রেডিং বেশ ঝুঁকিসম্পন্ন। ট্রেডিংয়ের জন্য demat account-এর পাশাপাশি একটি ট্রেডিং অ্যাকাউন্টও থাকতে হবে।
কয়ধরনের ট্রেডিং হয়?
1. ইন্ট্রাডে ট্রেডিং : এই ট্রেডিং পদ্ধতিতে আপনাকে একইদিনে স্টক কিনে আবার বিক্রি করতে হয়। একে ডে ট্রেডিংও বলা হয়। সেবির নিয়ম অনুযায়ী একইদিনে ট্রেড স্কোয়ার অফ করতে হয় ইন্ট্রাডে-তে।
2. ফিউচার ও অপশন : একে ডেরিভেটিভ ট্রেডিং-ও বলে যেখানে একটি কন্ট্রাক্ট বা চুক্তি করা হয় যার ভ্যালু underlying একটি অ্যাসেট বা সম্পদের ওপর নির্ভর করে। একজন ট্রেডার কন্ট্রাক্টের দাম অনুমান করেন এবং দামের ওঠানামার মাধ্যমে রিটার্ন জেনারেট করেন।
3. ডেলিভারি ট্রেডিং : একে ডেলিভারি ট্রেডিং-ও বলে যেখানে একজন ট্রেডার বা ইনভেস্টর শেয়ার কিনে পছন্দমতো সময়ের জন্য হোল্ড করে রেখে সুবিধা অনুযায়ী বিক্রি করেন। ডেলিভারি ট্রেডিংয়ের সঙ্গে অন্য ট্রেডিংয়ের পার্থক্য হল এখানে শর্ট সেলিং হয় না এবং এই ট্রেডিংয়ে আপনি যতদিন ইচ্ছে পজিশন হোল্ড করে রাখতে পারেন।
4. সুইং ট্রেডিং : এই ট্রেডিংয়ে একজন ট্রেডার সাধারণত কিছু সপ্তাহের জন্য পজিশন হোল্ড করে।
5. স্ক্যাল্প ট্রেডিং : এখানে হাই লিভারেজের ভিত্তিতে ট্রেড করা হয় এবং সামান্যতম দামের পরিবর্তনেও ট্রেডাররা ছোটো ছোটো প্রফিট করতে চান।
ইনভেস্টিং এবং ট্রেডিংয়ের পার্থক্য :
| Investing | Trading |
| ইনভেস্টিং-এ যেহেতু বেশি সময়ের জন্য স্টক হোল্ড করা হয় তাই এখানে ঝুঁকি কম। এছাড়াও স্বল্পমেয়াদের মার্কেট ভোলাটিলিটি ইনভেস্টিং-এ খুব সামান্যই প্রভাব ফেলে। | এখানে ঝুঁকি বেশি, কারণ ট্রেড করতে হলে লিভারেজ নিতে হয়। ফলে দামের সামান্যতম ওঠানামাতেই মূলধনের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। স্বল্পমেয়াদের ওঠানামার ফলে ট্রেডিং প্রভাবিত হয়। |
| বিনিয়োগ সাধারণত বেশি সময়ের জন্য করা হয়। | ট্রেডিং শর্ট টার্মের জন্য হয়। |
| ইনভেস্টিং-এ ক্যাপিটাল গ্রো করে ধীরে ধীরে, সময় নিয়ে। | অন্যদিকে, ট্রেডিংয়ে চটজলদি প্রফিট করার লক্ষ্য থাকে। |
| ইনভেস্টিং-এ প্রতিদিন শেয়ারের দামে নজর রাখতে হয় না বিশেষ, যেহেতু দীর্ঘমেয়াদের জন্য বিনিয়োগ করা হয়। | ট্রেডিংয়ের ক্ষেত্রে যেকোনো ট্রেড নেওয়ার আগে মার্কেট অ্যানালাইসিস করা একান্ত জরুরি। |
| এই ক্ষেত্রে ফান্ডামেন্টাল অ্যানালাইসিস প্রয়োজন। | এই ক্ষেত্রে টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিস প্রয়োজন। |
কাদের জন্য কোন বিকল্পটি ভালো?
প্রথমেই বলে রাখা দরকার যে ট্রেডিং বা ইনভেস্টিং যে কেউ করতে পারেন। এটি নির্ভর করছে ব্যক্তিবিশেষের চাহিদার ওপর। এবং এটি এমনই একটি স্কিল যা দীর্ঘ অনুশীলনের মাধ্যমে আরও উন্নত হয়।
ইনভেস্টিং অনেক সহজ এবং বেশিরভাগ সময় বিশেষ প্রাথমিক জ্ঞান ছাড়াও সরাসরি শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করা যায়। তবে বিনিয়োগের আগে যে স্টকটি নির্বাচন করা হবে তার গ্রোথ পোটেনশিয়াল সম্পর্কে জেনে নেওয়া উচিত।
অন্যদিকে ট্রেডিং করতে হলে আপনাকে স্টকের টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিস জানতে হবে, চার্ট প্যাটার্ন বুঝতে হবে। স্টক মার্কেটে একজন ট্রেডার হতে চাইলে যথেষ্ট জ্ঞান, এবং সময় দেওয়া প্রয়োজন। ট্রেডিং সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান না থাকলে বেশি ঝুঁকি নিয়ে ট্রেডিং না করাই ভালো। সেই তুলনায় ভালো কোম্পানি দেখে, অর্থাৎ কোম্পানির আর্নিং, ব্যালেন্স শিট ইত্যাদি দেখে সম্ভাবনাময় কোম্পানিতে বেশি সময়ের জন্য অর্থ বিনিয়োগ করলে ধীরে ধীরে ক্যাপিটাল অ্যাপ্রিসিয়েশন হয় এবং ঝুঁকিও অনেক কম থাকে।





