আজকে আমরা ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট নিয়ে আলোচনা করব। আপনারা যাঁরা স্টক ট্রেডিং-এর ব্যাপারে জানতে চান বা স্টক মার্কেট সম্পর্কে আগ্রহী তাঁরা সম্ভবত ‘ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট’ কথাটির সঙ্গে অল্পবিস্তর পরিচিত। কিন্তু এই অ্যাকাউন্ট কী, কেন প্রয়োজন আমাদের ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট, সেই ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করব।
আমরা যখন কোনো জিনিস কিনি, সেই ক্রয়ের প্রমাণস্বরূপ বিল বা রিসিট নিয়ে রাখি। ঠিক একইভাবে আগে যখন শেয়ারের লেনদেন হত তখন ফিজিক্যাল ফরম্যাট অর্থাৎ কাগজের নথিতে শেয়ার ক্রয়ের যাবতীয় তথ্য লেখা থাকত। যিনি শেয়ার কিনতেন তাঁর কাছে এই কাগজের দলিল থাকত প্রমাণস্বরূপ, যে তিনি কোন কোম্পানির শেয়ার কতটা কিনেছেন। তবে এতে বেশ সমস্যাই হত। কাগজপত্র হারিয়ে যাওয়া বা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তা ছাড়াও কাগজের দলিল তৈরি করা ও ফিজিক্যালি সেগুলি ডেলিভারি করাও বেশ সময়সাপেক্ষ কাজ। এই সমস্যাগুলির কথা মাথায় রেখে ১৯৯৬ সালে ডিমেটারিয়ালাইজেশন-এর কনসেপ্টটি আনা হয়। আমরা যে ‘ডিম্যাট’ কথাটি শুনি, এটি আসলে ডিমেটারিয়ালাইজেশনের সংক্ষিপ্তকরণ। তবে আগে আমাদের জানতে হবে এই জিনিসটি কী। ডিমেটারিয়ালাইজেশন হল সার্টিফিকেটগুলির ফিজিক্যাল কপিগুলিকে ডিজিটালে রূপান্তর করা। সহজভাবে বলতে হলে, শেয়ার সার্টিফিকেটগুলিকে কাগজের নথির বদলে ইলেক্ট্রনিক্যালি সংরক্ষণ করাই হল ডিমেটারিয়ালাইজেশন। যেহেতু বর্তমানে বিনিয়োগকারীরা ফিজিক্যাল নথির বদলে ভার্চুয়াল শেয়ার ও সিকিউরিটিগুলিকে সংরক্ষণ করছেন, তাই এই অ্যাকাউন্টকে ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট বলা হয়। বিনিয়োগকারীদের যাতে কাগজপত্রের ঝক্কি পোহাতে না হয়, ও যাতে তাঁরা রিয়্যাল টাইমে বিনিয়োগ করতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যেই মূলত demat account-এর কথা ভাবা হয়েছে।
ডিম্যাট অ্যাকাউন্টের বিষয়ে ভালোভাবে বুঝতে খুব সহজ একটি উদাহরণ দেওয়া যাক।
আমরা ধরে নিচ্ছি কোনো এক বিনিয়োগকারী XYZ কোম্পানির ১০টি শেয়ার কিনলেন। অর্থাৎ শেয়ারগুলি ওই বিনিয়োগকারীর নামে বরাদ্দ হল। এবার আগে কী হত? শেয়ার কেনার পর, এক্সচেঞ্জের তরফ থেকে ওই ব্যক্তির নামে শেয়ারের ফিজিক্যাল সার্টিফিকেট দেওয়া হত। সেই সার্টিফিকেটে ক্রয়-সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য দেওয়া থাকত। এবার, অস্বীকার করার জায়গা নেই, এই কাজে প্রচুর সময় ব্যয় হত, কারণ প্রতিবার শেয়ার কেনার পর সার্টিফিকেট তৈরি করতে হত ও প্রচুর সময় ও কাগজ নষ্ট হত। কিন্তু ১৯৯৬ সালে এই নিয়ম পরিবর্তন করে ফিজিক্যাল সার্টিফিকেটের পরিবর্তে ভার্চুয়ালি শেয়ারগুলি ধরে রাখার প্রক্রিয়া চালু হল, এতে অনেকটা সময়ও বাঁচল। আর যে অ্যাকাউন্টে শেয়ারের সার্টিফিকেট ইলেকট্রনিক ফর্মে ধরা থাকে, তাকে ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট বলে।
কেন আমাদের ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট প্রয়োজন?
এতক্ষণ আমরা জানলাম ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট কী। এবার কেন আমাদের এই অ্যাকাউন্টের দরকার বা এর সুবিধে কী কী সেগুলি জেনে নেওয়া যাক—
- আমরা জানলাম আগে কাগজের নথি প্রদান করা হত, যা ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট চালু হওয়ার পর ডিজিটাল সার্টিফিকেটে রূপান্তর করা হয়েছে। কাগজের সার্টিফিকেট তৈরির পদ্ধতি বেশ সময়সাপেক্ষ। তাছাড়াও এইপ্রকার নথি হারিয়ে বা নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রচুর। তবে ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট চালু হওয়ার পর শেয়ার সার্টিফিকেট নির্ঝঞ্ঝাটভাবে ডিজিটালি ট্রান্সফার করা সম্ভব হয়েছে।
- ডিম্যাট অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে শেয়ার সংরক্ষণ করা অনেক সোজা। যত খুশি শেয়ার সংরক্ষণ করা যায়। ফলে একসঙ্গে অনেক শেয়ার আপনি কিনে রেখে শেয়ারের ট্র্যাক রাখতে পারবেন। এছাড়াও একাধিক ডিম্যাট অ্যাকাউন্টও খুলে রাখতে পারেন।
- ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করাও বেশ সহজ। যে-কোনো স্মার্টফোন বা কম্পিউটার বা ল্যাপটপ থেকে অনায়াসে ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করতে পারা যায়। আর্থিকভাবে সুরক্ষিত ইনভেস্টিং-এর পথকে অনেকটাই সহজ করেছে ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট।
- ডিম্যাট অ্যাকাউন্টে কেবলমাত্র স্টক মার্কেটের শেয়ারই নয়, বরং মিউচুয়াল ফান্ড, ETF (Exchange Traded Fund), সরকারি সিকিউরিটি ইত্যাদি ধরে রাখা যায়। ফলে ডিম্যাট অ্যাকাউন্টের সাহায্যে সহজেই অনেক ধরনের সিকিউরিটিতে একসঙ্গে বিনিয়োগ করে পোর্টফোলিও ডাইভারসিফাই করা যায়।
- ব্যাংকের অ্যাকাউন্টের সঙ্গে আমরা সকলেই নমিনি যুক্ত করি কারণ জীবনের অনিশ্চয়তার কারণে অ্যাকাউন্টহোল্ডারের মৃত্যু হলে তাঁর জমানো অর্থ যাতে যোগ্য নমিনি পেতে পারেন। ঠিক একইরকমভাবে ডিম্যাট অ্যাকাউন্টের সঙ্গেও নমিনি যুক্ত করার বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো কারণবশত বিনিয়োগকারীর মৃত্যু হলে নমিনি ওই অ্যাকাউন্টের শেয়ারহোল্ডিং পাবেন। এর ফলে ভবিষ্যতে শেয়ার-সংক্রান্ত আইনি ঝামেলা এড়ানো যায়।
- যখনই আপনি কোনো শেয়ার কিনবেন বা বেচবেন, সেটি অ্যাকাউন্টে দেখা যাবে। ঠিক অনেকটা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মতোই। আপনি ‘buy’ অর্ডার দিলে ডিম্যাট অ্যাকাউন্টে তা credit হবে। অন্যদিকে ‘sell’ অর্ডার দিলে তা অ্যাকাউন্ট থেকে ডেবিট হয়ে যাবে। তবে সঙ্গে সঙ্গেই হয়তো এটি হবে না। এটি ডিম্যাট অ্যাকাউন্টে রিফ্লেক্ট হতে ১ থেকে ২ দিন সময় লাগে।
কীভাবে ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট খুলবেন ও কী কী নথি প্রয়োজন?
- ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট খুলতে হলে প্রথমেই যে-কোনো ডিপজিটরি পার্টিসিপেন্ট যেমন ব্রোকিং ফার্ম, ব্যাংক বা অন্য কোনো এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে অ্যাকাউন্ট ওপেনিং ফর্ম ভরতে হবে। CDSL ও NSDL-এর ওয়েবসাইটে ডিপজিটরি পার্টিসিপেন্টের তালিকা পেয়ে যাবেন।
- যাবতীয় প্রয়োজনীয় নথিপত্রের জেরক্স ও ফর্ম ডিপজিটরি পার্টিসিপেন্টের কাছে জমা করুন।
- ওপেনিং ফর্মের পাশাপাশি জরুরি নথি যেমন, প্যান কার্ড, ঠিকানার প্রমাণপত্র, পরিচয়ের প্রমাণপত্র ইত্যাদি জমা করতে হবে। তবে আলাদা আলদা ডিপজিটরি পার্টিসিপেন্টের ক্ষেত্রে নথি ভিন্ন হতে পারে।
- তারপর একটি in-person verification-এর জন্য ভিডিও কল বা সরাসরি DP অফিসে যেতে হবে।
- অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য ডিপজিটরি পার্টিসিপেন্ট আপনাকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ চার্জ করতে পারে। আবার অনেক DP-তে অ্যাকাউন্ট খুলতে হলে কোনো চার্জ দিতে হয় না।
- আপনার আবেদন অনুমোদিত হলে একটি চুক্তিপত্রে আপনাকে সই করতে হবে। এই চুক্তিপত্রে ডিম্যাট অ্যাকাউন্টের শর্তাবলি লেখা থাকে।
- ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট খুলে গেলেই আপনাকে অ্যাকাউন্ট নম্বর সহ সমস্ত তথ্য প্রদান করা হবে।





